osudhkosh

হামের প্রকোপ ২০২৬: লক্ষণ, জটিলতা ও টিকা ক্যাম্পেইনের গাইড

Published: September 11, 2026

Share:
হামের প্রকোপ ২০২৬: লক্ষণ, জটিলতা ও টিকা ক্যাম্পেইনের গাইড

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের হামের প্রকোপ ইতিমধ্যে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ শিশু স্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সারাদেশে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০ জন শিশু হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যু হয়েছে ১,০০২ জনের। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মৃত শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশ ভর্তির মাত্র দুই দিনের মধ্যেই মারা গেছে — অর্থাৎ দেরিতে চিকিৎসা নেওয়াই বহু ক্ষেত্রে প্রাণহানির বড় কারণ। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় দফার বিশেষ হামের টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করছে। এর আগের ‘মপ-আপ’ কার্যক্রমে নতুন করে ১৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হলেও, প্রায় ৪০ লাখ পথশিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে। এই লেখায় হামের কারণ, লক্ষণ, বিপদ চিহ্ন, চিকিৎসা এবং টিকা ক্যাম্পেইন সম্পর্কে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া হলো।

হাম কী এবং কেন হয়?

হাম (Measles/Rubeola) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মর্বিলিভাইরাস (Morbillivirus) দ্বারা সৃষ্ট হয়। এটি মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় — আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ভাইরাসকণা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে বা সংক্রমিত পৃষ্ঠ স্পর্শ করে চোখ-মুখ-নাকে হাত দিলে সংক্রমণ ঘটে। হাম এতটাই ছোঁয়াচে যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন — যা ইনফ্লুয়েঞ্জা বা কোভিড-১৯-এর তুলনায় অনেক বেশি সংক্রামক। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি র‍্যাশ ওঠার প্রায় চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন, ফলে লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই রোগ ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রকোপের পেছনে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মূলত টিকাদানে বড় ধরনের ফাঁককে দায়ী করছেন। যেসব শিশু নিয়মিত EPI কর্মসূচির আওতায় আসেনি — বিশেষ করে পথশিশু, দুর্গম এলাকার শিশু ও বস্তি এলাকার শিশুরা — তাদের মধ্যে দলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা (herd immunity) তৈরি না হওয়ায় ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এবং ধীরে ধীরে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

হামের লক্ষণ: ধাপে ধাপে যা ঘটে

হামের লক্ষণ সাধারণত ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। ক্লিনিক্যালি হামকে চেনার জন্য চিকিৎসকেরা তথাকথিত “৩ সি” লক্ষণের কথা বলেন —

  • Cough (কাশি): শুকনো, ক্রমাগত কাশি।
  • Coryza (সর্দি): নাক দিয়ে পানি পড়া।
  • Conjunctivitis (চোখ লাল হওয়া): চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও পানি পড়া।

এর সঙ্গে থাকে তীব্র জ্বর (প্রায়ই ১০৩–১০৪° ফারেনহাইটের বেশি)। জ্বর শুরুর ২-৩ দিন পর মুখের ভেতরের অংশে, বিশেষত গালের ভেতরের দিকে, ছোট ছোট সাদা দানার মতো দাগ দেখা যায় — একে বলা হয় কপলিক স্পট (Koplik spots), যা হাম নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চিহ্ন। এর ১-২ দিন পর মুখ ও কপালের কাছ থেকে শুরু করে লালচে-বাদামি ছোপ ছোপ র‍্যাশ ধীরে ধীরে ঘাড়, বুক, হাত-পা ও শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়ে — একে বলা হয় সেফালোকডাল (cephalocaudal) বিস্তার। র‍্যাশ ওঠার পর জ্বর সাধারণত আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয় এবং পুরো রোগ সেরে উঠতে ১০-১৪ দিন সময় লাগতে পারে।

বিপদ চিহ্ন ও জটিলতা: কখন গুরুতর হতে পারে

হাম নিজে থেকে সাধারণত ধীরে ধীরে সেরে গেলেও এর জটিলতাগুলোই মূলত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে, বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা বা ভিটামিন-এ ঘাটতিতে থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে। গবেষণা অনুযায়ী সাধারণ জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে —

  • ডায়রিয়া: প্রায় ৮% রোগীর মধ্যে দেখা যায়, যা দ্রুত পানিশূন্যতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।
  • কানের সংক্রমণ (Otitis media): প্রায় ৭-৯% ক্ষেত্রে হয়, যা থেকে দীর্ঘস্থায়ী শ্রবণ সমস্যাও হতে পারে।
  • নিউমোনিয়া: প্রায় ১-৬% রোগীর মধ্যে দেখা যায় এবং হাম-সংক্রান্ত মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ এটিই। বাংলাদেশের বর্তমান প্রকোপেও নিউমোনিয়া জটিলতাই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটাচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
  • এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ): প্রতি ১,০০০-২,০০০ জনে ১ জনের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে, যা স্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
  • সাবঅ্যাকিউট স্ক্লেরোজিং প্যান-এনসেফালাইটিস (SSPE): এটি একটি অত্যন্ত বিরল কিন্তু মারাত্মক দেরিতে দেখা দেওয়া জটিলতা, যা হাম সেরে যাওয়ার ৭-১০ বছর পরও মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে ক্ষতি করে এবং প্রায় সবসময় মৃত্যুর কারণ হয়।
  • চোখের ক্ষতি ও অন্ধত্ব: ভিটামিন-এ ঘাটতিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে হামের কারণে কর্নিয়ার ক্ষতি ও স্থায়ী দৃষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়ে।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি: শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, র‍্যাশ ওঠার পরও তিন দিনের বেশি প্রবল জ্বর, শিশুর অতিরিক্ত নিস্তেজতা বা জাগানো কঠিন হওয়া, খিঁচুনি, তীব্র পানিশূন্যতার লক্ষণ (প্রস্রাব কমে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে যাওয়া) এবং কানে ব্যথা বা কান দিয়ে তরল পড়া। বাংলাদেশের তথ্য বলছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মৃত শিশুদের একটি বড় অংশ ভর্তির প্রথম দুই দিনের মধ্যেই মারা গেছে — তাই সামান্যতম বিপদ চিহ্ন দেখা দিলেও অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়?

হাম মূলত ক্লিনিক্যাল লক্ষণের ভিত্তিতেই নির্ণয় করা হয় — জ্বরের সঙ্গে সাধারণ র‍্যাশ এবং কাশি, সর্দি বা কনজাংটিভাইটিসের যেকোনো একটি উপস্থিত থাকলে চিকিৎসক হামের সন্দেহ করেন। প্রাদুর্ভাব চলাকালীন নিশ্চিতকরণের জন্য রক্তের সেরোলজি (IgM অ্যান্টিবডি) পরীক্ষা বা RT-PCR পরীক্ষা করা হয়, বিশেষত সরকারি সার্ভেইল্যান্সের জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয় যাতে সংক্রমণের প্রকৃত বিস্তার বোঝা যায়। সাধারণ রোগীর ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল নির্ণয়ই যথেষ্ট এবং এর ভিত্তিতেই চিকিৎসা শুরু করা হয়।

চিকিৎসা ও ঘরোয়া যত্ন

হামের কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই — চিকিৎসা মূলত সহায়ক (supportive), অর্থাৎ লক্ষণ ও জটিলতা নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়া হয়।

  • জ্বর নিয়ন্ত্রণ: প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ (যেমন নাপা) চিকিৎসক বা প্যাকেজে নির্দেশিত মাত্রায় জ্বর ও গায়ে ব্যথা কমাতে ব্যবহার করা যায়।
  • তরল ও পুষ্টি: ডায়রিয়া বা কম খাওয়ার কারণে পানিশূন্যতা এড়াতে ওরাল স্যালাইন (ORS) ও পর্যাপ্ত তরল খাওয়ানো জরুরি। সহজপাচ্য, পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে যাতে শরীর দ্রুত সেরে উঠতে পারে।
  • ভিটামিন-এ: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সুপারিশ অনুযায়ী, হাম আক্রান্ত সব শিশুকেই ভিটামিন-এ দেওয়া উচিত জটিলতা ও চোখের ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে — ৬-১১ মাস বয়সীদের জন্য ১,০০,০০০ IU এবং ১২ মাস বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ২,০০,০০০ IU করে পরপর দুই দিন। ভিটামিন-এ ঘাটতির লক্ষণ থাকলে ২-৪ সপ্তাহ পর তৃতীয় একটি ডোজও দেওয়া হতে পারে। এই মাত্রা সাধারণ পরিপূরকের চেয়ে অনেক বেশি বলে এটি অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই দেওয়া উচিত, নিজে থেকে নয়।
  • বিশ্রাম ও আলাদা রাখা: শিশুকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে এবং র‍্যাশ ওঠার পর অন্তত চার দিন অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়। ঘরের আলো একটু কম রাখা ভালো, কারণ চোখ সংবেদনশীল হয়ে থাকে।
  • অ্যান্টিবায়োটিক: শুধু ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতা (যেমন নিউমোনিয়া বা কানের সংক্রমণ) দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে — হাম ভাইরাসজনিত হওয়ায় সাধারণভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না।

বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

কিছু গোষ্ঠীর জন্য হাম বিশেষভাবে বিপজ্জনক হতে পারে —

  • ৯ মাসের কম বয়সী শিশু: যারা এখনো প্রথম টিকার ডোজ পায়নি, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বর্তমান প্রকোপে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ পাওয়া গেছে, যা উদ্বেগজনক।
  • অপুষ্ট শিশু: অপুষ্টি ও ভিটামিন-এ ঘাটতিতে থাকা শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
  • গর্ভবতী নারী: হাম গর্ভপাত, অকাল প্রসব বা কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি: ক্যান্সার চিকিৎসাধীন, HIV আক্রান্ত বা অন্য কারণে ইমিউনোকমপ্রোমাইজড ব্যক্তিদের মধ্যে জটিলতার ঝুঁকি বেশি।
  • টিকার বাইরে থাকা পথশিশু: বাংলাদেশে প্রায় ৪০ লাখ পথশিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে জানা গেছে, যা প্রকোপ দীর্ঘায়িত হওয়ার একটি বড় কারণ।

হামের টিকা ও ২০২৬ সালের বিশেষ ক্যাম্পেইন

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী নিয়মিত সূচিতে শিশুদের ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার প্রথম ডোজ (MR1) এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ (MR2) দেওয়া হয়। গবেষণা অনুযায়ী একটি ডোজে প্রায় ৯৩% এবং দুটি ডোজ সম্পূর্ণ হলে প্রায় ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা মেলে।

বর্তমান প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে একটি ‘মপ-আপ’ (mop-up) কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যার মাধ্যমে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তা সত্ত্বেও সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে দ্বিতীয় দফার বিশেষ হামের টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করছে। ইউনিসেফের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় টিকার বেশিরভাগ চালান ইতিমধ্যে দেশে পৌঁছেছে এবং বাকি অংশ শিগগিরই আসার কথা। এই ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য হলো নিয়মিত EPI সূচির বাইরে থেকে যাওয়া শিশু, বিশেষ করে পথশিশু ও দুর্গম এলাকার শিশুদের টিকার আওতায় আনা, যাতে সমাজে পর্যাপ্ত দলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় এবং প্রকোপ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে।

টিকার নিরাপত্তা: MR/MMR টিকা বিশ্বব্যাপী কয়েক দশক ধরে ব্যবহৃত একটি সুরক্ষিত টিকা। সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ইনজেকশনের স্থানে সামান্য ব্যথা বা ফোলাভাব, এবং টিকা দেওয়ার ৫-১২ দিন পর হালকা জ্বর বা সামান্য র‍্যাশ দেখা দিতে পারে, যা সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। গুরুতর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত বিরল। যেসব শিশুর তীব্র জ্বর, গুরুতর অসুস্থতা বা মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসজনিত সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে টিকা দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন — সাধারণ সর্দি-কাশি বা হালকা অসুস্থতা টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নয়।

হাম বনাম অন্যান্য মিলে যাওয়া অসুখ

অনেক অভিভাবক হামের র‍্যাশকে অন্য রোগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। কিছু পার্থক্য জেনে রাখা ভালো —

  • রুবেলা (জার্মান হাম): সাধারণত হামের তুলনায় অনেক হালকা জ্বর ও র‍্যাশ নিয়ে আসে এবং দ্রুত সেরে যায়, তবে গর্ভবতী নারীর জন্য এটি অনাগত সন্তানের জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে বলে বিশেষভাবে বিপজ্জনক।
  • রোজিওলা: সাধারণত দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হয়, তীব্র জ্বরের পর জ্বর কমে গিয়ে র‍্যাশ ওঠে, যেখানে হামে জ্বর ও র‍্যাশ একসঙ্গে থাকে এবং ক্রমশ বাড়ে।
  • ডেঙ্গুর র‍্যাশ: সাধারণত জ্বরের ৩-৫ দিন পর দেখা দেয় এবং এর সঙ্গে থাকে তীব্র গা-ব্যথা, প্লাটিলেট কমে যাওয়া — যা হামে দেখা যায় না।
  • চিকেনপক্স: র‍্যাশ শুরু হয় ছোট ছোট চুলকানিযুক্ত ফোসকা হিসেবে, যা হামের সমতল লালচে দাগের চেয়ে আলাদা।

সন্দেহ হলে নিজে নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ, কারণ সঠিক নির্ণয়ের ওপর সঠিক চিকিৎসা ও অন্যদের সুরক্ষা নির্ভর করে।

প্রতিরোধে করণীয়

  • শিশুর EPI সূচি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে MR1 ও MR2 টিকা সম্পূর্ণ করুন — কোনো ডোজ বাদ পড়লে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দ্রুত তা সম্পন্ন করুন।
  • ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিশেষ ক্যাম্পেইনে আপনার শিশু যোগ্য হলে অবশ্যই তাকে টিকা দিন, বিশেষত আগে কোনো ডোজ মিস হয়ে থাকলে।
  • আক্রান্ত শিশুকে র‍্যাশ ওঠার পর অন্তত চার দিন স্কুল বা জনসমাগম থেকে দূরে রাখুন যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
  • হাত ধোয়ার অভ্যাস ও শ্বাসতন্ত্রের হাইজিন (কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢাকা) বজায় রাখুন।
  • শিশুর পুষ্টি ও ভিটামিন-এ চাহিদা পূরণে সবুজ শাকসবজি, ডিম, দুধের মতো খাবার নিয়মিত খাওয়ান, যা জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
  • পরিবারের বড়রাও যদি ছোটবেলায় হামের টিকা না নিয়ে থাকেন বা নিশ্চিত না হন, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কারণ প্রাপ্তবয়স্করাও হামে আক্রান্ত হতে পারেন এবং শিশুদের মধ্যে ছড়াতে পারেন।

এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য এবং কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ বা কোনো বিপদ চিহ্ন দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসক বা হাসপাতালে যোগাযোগ করুন এবং টিকা সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে EPI স্বাস্থ্যকর্মী বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর তথ্য ও নির্দেশিকা অনুসরণে লেখা।

Frequently Asked Questions

হাম কীভাবে ছড়ায়?
হাম আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ভাইরাসকণা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে সংক্রমণ ঘটে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন এবং র‍্যাশ ওঠার চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন।
হামের প্রথম লক্ষণ কী কী?
প্রথমে জ্বর, কাশি, সর্দি ও চোখ লাল হওয়া দেখা যায়। জ্বর শুরুর ২-৩ দিন পর মুখের ভেতরে সাদা দানার মতো কপলিক স্পট দেখা দেয় এবং এর ১-২ দিন পর মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র‍্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।
হাম হলে কখন সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া উচিত?
শ্বাসকষ্ট, র‍্যাশ ওঠার পরও তিন দিনের বেশি প্রবল জ্বর, খিঁচুনি, অতিরিক্ত নিস্তেজতা বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে। বাংলাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মৃত শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশ ভর্তির দুই দিনের মধ্যেই মারা গেছে, তাই দেরি করা বিপজ্জনক।
হাম আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন-এ কেন ও কীভাবে দেওয়া হয়?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী ৬-১১ মাস বয়সীদের ১,০০,০০০ IU এবং ১২ মাস বা তার বেশি বয়সীদের ২,০০,০০০ IU করে পরপর দুই দিন ভিটামিন-এ দেওয়া হয়, যা জটিলতা ও চোখের ক্ষতির ঝুঁকি কমায়। এই বেশি মাত্রার ভিটামিন-এ অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে দিতে হবে।
বাংলাদেশে MR টিকা কবে কবে দেওয়া হয়?
EPI সূচি অনুযায়ী ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (MR) টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। একটি ডোজে প্রায় ৯৩% এবং দুটি ডোজ সম্পূর্ণ হলে প্রায় ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা মেলে।
টিকা নেওয়ার পরও কি হাম হতে পারে?
হ্যাঁ, তবে সম্ভাবনা কম। যেহেতু কোনো টিকাই ১০০% সুরক্ষা দেয় না, তাই টিকা নেওয়া শিশুর মধ্যে বিরল ক্ষেত্রে মৃদু আকারে হাম হতে পারে, তবে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক কম থাকে।
২৫ সেপ্টেম্বরের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইনে কারা টিকা পাবে?
এই দ্বিতীয় দফার ক্যাম্পেইনের মূল লক্ষ্য নিয়মিত EPI সূচির বাইরে থেকে যাওয়া শিশু, বিশেষ করে পথশিশু ও দুর্গম এলাকার শিশুদের টিকার আওতায় আনা। এর আগের মপ-আপ কার্যক্রমে ১৪ লাখ শিশুকে নতুন করে টিকা দেওয়া হলেও প্রায় ৪০ লাখ পথশিশু এখনো টিকার বাইরে রয়ে গেছে।
হাম ও রুবেলার (জার্মান হাম) মধ্যে পার্থক্য কী?
রুবেলা সাধারণত হামের তুলনায় অনেক হালকা জ্বর ও র‍্যাশ নিয়ে আসে এবং দ্রুত সেরে যায়, তবে গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এটি অনাগত সন্তানের জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে বলে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
Share:

Comments

No comments yet. Be the first to comment.

Leave a comment

Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.

Never published

Published after review.

More news

কোন বয়সে কত প্রেসার স্বাভাবিক? ১২০/৮০, ১৩০/৮০ নাকি ১৪০/৯০

কোন বয়সে কত প্রেসার স্বাভাবিক? ১২০/৮০, ১৩০/৮০ নাকি ১৪০/৯০

বয়স অনুযায়ী প্রেসার কত থাকা উচিত? ১২০/৮০ কি স্বাভাবিক, ১৩০/৮০ বা ১৪০/৯০ হলে কী বোঝায়? জেনে নিন রক্তচাপের সঠিক মাত্রা, উচ্চ-নিম্ন প্রেসারের লক্ষণ এবং বাড়িতে সঠিকভাবে BP মাপার নিয়ম।

September 1, 2026

Period Odour: Causes, Prevention, Hygiene Tips & When to See a Doctor

Period Odour: Causes, Prevention, Hygiene Tips & When to See a Doctor

A mild odour during menstruation is usually normal. However, a strong or persistent smell accompanied by itching, burning, unusual discharge, or pelvic pain may indicate an underlying infection. This comprehensive guide explains the causes of period odour, hygiene tips, prevention strategies, and when to seek medical attention.

August 31, 2026

ওয়াশরুমে টুথব্রাশ রাখা কি নিরাপদ? সঠিকভাবে রাখার নিয়ম জানুন

ওয়াশরুমে টুথব্রাশ রাখা কি নিরাপদ? সঠিকভাবে রাখার নিয়ম জানুন

ওয়াশরুমে টুথব্রাশ রাখা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। টয়লেটের কাছে রাখলে কি জীবাণু টুথব্রাশে ছড়িয়ে পড়তে পারে? জেনে নিন টুথব্রাশ পরিষ্কার ও নিরাপদে রাখার সঠিক নিয়ম।

August 30, 2026