নবজাতকের টিকার তালিকা – কখন কোনটি দিতে হবে (সম্পূর্ণ গাইড)
Published: July 19, 2026

একটি শিশুর জন্মের পর থেকেই তার শরীর ধীরে ধীরে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে। এই সময়ে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সময়মতো টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টিকাদান শুধু একটি নির্দিষ্ট রোগ প্রতিরোধ করে না, বরং ভবিষ্যতে অনেক জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেও শিশুকে সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশে সরকারি ইপিআই (Expanded Programme on Immunization) কর্মসূচির মাধ্যমে বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। এছাড়াও কিছু অতিরিক্ত টিকা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাওয়া যায়।
কেন নবজাতকের টিকা এত গুরুত্বপূর্ণ?
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জন্মের সময় পুরোপুরি পরিপক্ব থাকে না। তাই টিকার মাধ্যমে শরীরকে নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সক্ষমতা তৈরি করে দেওয়া হয়।
সময়মতো টিকা দিলে যেসব সুবিধা পাওয়া যায়—
যক্ষ্মা, পোলিও, হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমে।
নিউমোনিয়া ও মেনিনজাইটিসের মতো মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।
শিশুর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
সমাজে সংক্রামক রোগের বিস্তার কমাতে ভূমিকা রাখে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
সরকারি ইপিআই (EPI) টিকাদান সময়সূচি
👶 জন্মের পরপর
💉 BCG
রোগ প্রতিরোধ করে: যক্ষ্মা (টিবি)
ডোজ: ১টি
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 OPV (জিরো ডোজ)
রোগ প্রতিরোধ করে: পোলিও
ডোজ: ১টি
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
👶 ৬ সপ্তাহ
💉 Pentavalent-1
রোগ প্রতিরোধ করে: ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি এবং Hib
ডোজ: ১ম
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 PCV-1
রোগ প্রতিরোধ করে: নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া
ডোজ: ১ম
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 OPV-1
রোগ প্রতিরোধ করে: পোলিও
ডোজ: ১ম
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
👶 ১০ সপ্তাহ
💉 Pentavalent-2
রোগ প্রতিরোধ করে: ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি এবং Hib
ডোজ: ২য়
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 PCV-2
রোগ প্রতিরোধ করে: নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া
ডোজ: ২য়
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 OPV-2
রোগ প্রতিরোধ করে: পোলিও
ডোজ: ২য়
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
👶 ১৪ সপ্তাহ
💉 Pentavalent-3
রোগ প্রতিরোধ করে: ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি এবং Hib
ডোজ: ৩য়
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 PCV-3
রোগ প্রতিরোধ করে: নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া
ডোজ: ৩য়
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
💉 OPV-3
রোগ প্রতিরোধ করে: পোলিও
ডোজ: ৩য়
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
👶 ৯ মাস
💉 MR (হাম-রুবেলা)
রোগ প্রতিরোধ করে: হাম ও রুবেলা
ডোজ: ১টি
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
👶 ১৫ মাস
💉 DPT Booster / TT
রোগ প্রতিরোধ করে: ডিফথেরিয়া, হুপিংকাশি ও ধনুষ্টংকার
ডোজ: বুস্টার
আবশ্যক: ✅ হ্যাঁ
কোথায় পাওয়া যায়: সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই টিকাকেন্দ্র
🏥 বেসরকারি (ঐচ্ছিক) টিকাদান সময়সূচি
💉 হেপাটাইটিস বি (Birth Dose)
শুরু করার বয়স: জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে
রোগ প্রতিরোধ করে: হেপাটাইটিস বি
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 রোটাভাইরাস ভ্যাকসিন
শুরু করার বয়স: ৬ সপ্তাহ
রোগ প্রতিরোধ করে: তীব্র ডায়রিয়া
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 কলেরা ভ্যাকসিন
শুরু করার বয়স: দেড় মাসের পর
রোগ প্রতিরোধ করে: কলেরা
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন
শুরু করার বয়স: ৬ মাস
রোগ প্রতিরোধ করে: মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 চিকেনপক্স (Varicella)
শুরু করার বয়স: ১২ মাস
রোগ প্রতিরোধ করে: জলবসন্ত
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 মেনিনজোকক্কাল ভ্যাকসিন
শুরু করার বয়স: ১ বছর বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী
রোগ প্রতিরোধ করে: মেনিনজাইটিস
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 হেপাটাইটিস A
শুরু করার বয়স: ১৮ মাস
রোগ প্রতিরোধ করে: হেপাটাইটিস A
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
💉 টাইফয়েড ভ্যাকসিন
শুরু করার বয়স: ২ বছর
রোগ প্রতিরোধ করে: টাইফয়েড জ্বর
আবশ্যক: ❌ না
কোথায় পাওয়া যায়: প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক
শিশুকে টিকা দেওয়ার আগে যেসব বিষয় জানা উচিত
টিকা দেওয়ার দিন শিশুকে স্বাভাবিকভাবে খাওয়ানো যেতে পারে। টিকা নেওয়ার আগে শিশুর যদি জ্বর, গুরুতর অসুস্থতা বা অন্য কোনো চিকিৎসা চলতে থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
টিকা দেওয়ার সময় শিশুর ইপিআই কার্ড সঙ্গে রাখুন এবং প্রতিটি ডোজের তারিখ লিখে রাখুন। এতে পরবর্তী টিকা মিস হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
টিকা নেওয়ার পর কী হতে পারে?
টিকা দেওয়ার পরে কিছু স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এগুলো সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যেই ভালো হয়ে যায়।
যেমন—
হালকা জ্বর
ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা
সামান্য ফোলা
শিশুর অস্থিরতা
বেশি ঘুমানো
এসব নিয়ে সাধারণত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে যদি শিশুর উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
টিকা দিতে দেরি হলে কী করবেন?
অনেক সময় বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত তারিখে টিকা দেওয়া সম্ভব হয় না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন হয় না।
যা করবেন—
যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী Catch-up Vaccination সম্পন্ন করুন।
পরবর্তী ডোজের নতুন সময়সূচি সংগ্রহ করুন।
ভবিষ্যতের টিকার তারিখ ক্যালেন্ডার বা মোবাইলে সংরক্ষণ করুন।
যদি কোনো টিকা মিস হয়ে যায়
এক বা একাধিক টিকা মিস হয়ে গেলেও আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী বাকি ডোজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
মনে রাখবেন—
নিজে থেকে টিকা বাদ দেবেন না।
স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুযায়ী নতুন সময়সূচি অনুসরণ করুন।
টিকাদান কার্ড সংরক্ষণ করুন।
প্রতিটি ডোজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত ফলোআপ করুন।
টিকাদানের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
সবসময় সরকারি বা নিবন্ধিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা নিন।
টিকা নেওয়ার পর অন্তত ২০–৩০ মিনিট পর্যবেক্ষণে থাকুন।
টিকার কার্ড হারাবেন না।
টিকার তারিখ আগে থেকেই লিখে রাখুন।
শিশুর ওজন ও স্বাস্থ্যের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো টিকা বাদ দেবেন না।
উপসংহার
শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান সম্পন্ন করা। জন্মের পর থেকেই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রতিটি টিকা দিলে অনেক প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগ থেকে শিশুকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। তাই ইপিআই কার্ড সংরক্ষণ করুন, নির্ধারিত তারিখ মনে রাখুন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সব ডোজ সম্পূর্ণ করুন।
FAQ
১. নবজাতকের প্রথম টিকা কোনটি?
জন্মের পর সাধারণত BCG, OPV (জিরো ডোজ) এবং হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া হয়।
২. শিশুর টিকা মিস হলে কি আবার শুরু করতে হবে?
না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যাচ-আপ টিকাদান সম্পন্ন করলেই হয়।
৩. টিকা দেওয়ার পর জ্বর হওয়া কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ। অনেক টিকার পর হালকা জ্বর বা ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক এবং সাধারণত ১–২ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়।
৪. সরকারি টিকা কোথায় পাওয়া যায়?
সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইপিআই টিকাদান কেন্দ্রে বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
৫. সব বেসরকারি টিকা কি বাধ্যতামূলক?
না। বেসরকারি টিকার বেশিরভাগই অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য দেওয়া হয়। কোন টিকা প্রয়োজন হবে তা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
ইপিআই (EPI) টিকা কয়টি ও কী কী?
বাংলাদেশের ইপিআই (Expanded Programme on Immunization) কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য একাধিক টিকা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রদান করা হয়। এসব টিকার মাধ্যমে মোট ১১টি রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়।
ইপিআই কর্মসূচির আওতায় যেসব রোগের বিরুদ্ধে টিকা দেওয়া হয়:
যক্ষ্মা (Tuberculosis)
পোলিও (Poliomyelitis)
ডিফথেরিয়া (Diphtheria)
হুপিংকাশি (Pertussis)
ধনুষ্টংকার (Tetanus)
হেপাটাইটিস বি (Hepatitis B)
হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি (Hib) সংক্রমণ
নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া (Pneumococcal Disease)
হাম (Measles)
রুবেলা (Rubella)
Hib-জনিত মেনিনজাইটিস ও অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা
দ্রষ্টব্য: ইপিআই টিকাগুলো সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং নির্ধারিত টিকাদান কেন্দ্রে বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রতিটি ডোজ সম্পন্ন করা শিশুর সর্বোচ্চ সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
Comments
No comments yet. Be the first to comment.
Leave a comment
Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.


