গ্যাস্ট্রিক নাকি হার্টের ব্যথা? পার্থক্য জানুন | লক্ষণ ও করণীয়
Published: July 21, 2026

গ্যাস্ট্রিক নাকি হার্টের ব্যথা? পার্থক্য জানুন
অনেক সময় বুকে ব্যথা শুরু হলে আমরা ধরে নিই এটি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। আবার কেউ কেউ অযথাই ভয় পেয়ে ভাবেন এটি হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ। বাস্তবে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা এবং হৃদরোগজনিত ব্যথার কিছু মিল থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যগুলো জানা থাকলে প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় এবং জীবন রক্ষা করা যেতে পারে।
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা কী?
গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির কারণে পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হলে বুকে জ্বালাপোড়া, অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। সাধারণত এটি খাওয়া-দাওয়া, জীবনযাপন বা হজমের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
গ্যাস্ট্রিকের সাধারণ লক্ষণ
বুকে বা পেটের উপরের অংশে জ্বালাপোড়া
টক ঢেকুর ওঠা
পেট ফাঁপা বা গ্যাস হওয়া
খাবার খাওয়ার পর অস্বস্তি বৃদ্ধি পাওয়া
মুখে টক বা তেতো স্বাদ অনুভব করা
অ্যান্টাসিড খেলে কিছুটা আরাম পাওয়া
হার্টের ব্যথা কী?
হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ কমে গেলে বা করোনারি ধমনিতে ব্লক তৈরি হলে বুকে ব্যথা হতে পারে। এটি এনজাইনা বা হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসার বিষয়।
হার্টের ব্যথার সাধারণ লক্ষণ
বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি বা চেপে ধরা ব্যথা
ব্যথা বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া
শ্বাসকষ্ট
অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগা
বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
বিশ্রাম নিলেও ব্যথা কমে না
গ্যাস্ট্রিক ও হার্টের ব্যথার পার্থক্য
১. ব্যথার অবস্থান
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা
সাধারণত বুকের নিচের অংশ বা পেটের উপরের অংশে অনুভূত হয়।
অনেক সময় বুক জ্বালাপোড়ার মতো লাগে।
হার্টের ব্যথা
বুকের মাঝখানে চাপ বা ভারী অনুভূতি হয়।
ব্যথা বাম হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে যেতে পারে।
২. ব্যথার ধরন
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা
জ্বালাপোড়া, টক ভাব বা গ্যাস জমে থাকার মতো অনুভূতি হয়।
খাবার খাওয়ার পর বা খালি পেটে বাড়তে পারে।
হার্টের ব্যথা
বুকের ওপর ভারী কিছু চাপা আছে বা শক্ত করে চেপে ধরেছে—এমন অনুভূতি হয়।
হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা, ব্যায়াম বা মানসিক চাপের সময় বাড়তে পারে।
৩. কতক্ষণ স্থায়ী হয়
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা
কিছু সময় পর নিজে থেকেই কমে যেতে পারে।
অ্যান্টাসিড বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেলে অনেক ক্ষেত্রে আরাম পাওয়া যায়।
হার্টের ব্যথা
সাধারণত ১০–১৫ মিনিট বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্রাম নিলেও সব সময় কমে না।
৪. অন্যান্য লক্ষণ
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথার সঙ্গে থাকতে পারে
টক ঢেকুর
পেট ফাঁপা
বমি বমি ভাব
বুক জ্বালাপোড়া
হার্টের ব্যথার সঙ্গে থাকতে পারে
শ্বাসকষ্ট
ঠান্ডা ঘাম
মাথা ঘোরা
অতিরিক্ত দুর্বল লাগা
বমি বমি ভাব বা বমি
৫. ওষুধে প্রতিক্রিয়া
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা
অ্যান্টাসিড বা গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে সাধারণত কিছুটা আরাম পাওয়া যায়।
হার্টের ব্যথা
গ্যাস্ট্রিকের ওষুধে সাধারণত উপশম হয় না।
তাই এমন ব্যথাকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
মনে রাখুন
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা এবং হার্টের ব্যথার কিছু লক্ষণ একে অপরের সঙ্গে মিল থাকতে পারে। তবে যদি বুকের ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, বাম হাত বা চোয়ালে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, অথবা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথা থাকে, তাহলে এটিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত হাসপাতালে বা নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
কখন জরুরি হাসপাতালে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যান—
বুকের ব্যথা ১০–১৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হলে
ব্যথা বাম হাত, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে
শ্বাস নিতে কষ্ট হলে
ঠান্ডা ঘাম হলে
অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি হলে
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা পূর্বে হৃদরোগ থাকলে বুকে নতুন ধরনের ব্যথা শুরু হলে
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
নিচের ব্যক্তিদের হার্টের ব্যথার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি—
উচ্চ রক্তচাপের রোগী
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
ধূমপায়ী
অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তি
উচ্চ কোলেস্টেরল রয়েছে এমন ব্যক্তি
পরিবারের কারও অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে
নিয়মিত ব্যায়াম না করলে
কী করবেন?
বুকে ব্যথাকে কখনোই হালকাভাবে নেবেন না।
ব্যথার কারণ নিশ্চিত না হলে নিজে নিজে ওষুধ সেবন করবেন না।
বারবার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করান।
হার্টের ব্যথার সন্দেহ হলে দ্রুত জরুরি বিভাগে যান।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনুসরণ করুন।
প্রতিরোধের উপায়
স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
অতিরিক্ত তেল, ঝাল ও ভাজাপোড়া খাবার কম খান।
ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য সম্পূর্ণ পরিহার করুন।
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
উপসংহার
গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা এবং হার্টের ব্যথার কিছু লক্ষণ একরকম মনে হলেও এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন সমস্যা। বুকে ব্যথা হলে শুধুমাত্র গ্যাস্ট্রিক ভেবে অবহেলা করা বিপজ্জনক হতে পারে। বিশেষ করে ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, হাত বা চোয়ালে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া কিংবা দীর্ঘ সময় ধরে ব্যথা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্তই অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচাতে পারে।
সতর্কতা: এই লেখাটি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যবিষয়ক সাধারণ তথ্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। কোনো ধরনের তীব্র বা অস্বাভাবিক বুকের ব্যথা হলে দ্রুত নিবন্ধিত চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন।
Comments
No comments yet. Be the first to comment.
Leave a comment
Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.


