জিমে কেন হার্ট অ্যাটাক হয়? ঝুঁকি, সতর্কতা ও নিরাপদ ব্যায়ামের সম্পূর্ণ নির্দেশিকা
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬
জিমে কেন হার্ট অ্যাটাক হয়: ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক নির্দেশিকা
ব্যায়াম আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে, মন ভালো করে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। নিয়মিত শরীরচর্চা প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু সম্প্রতি জিমে ব্যায়াম করতে গিয়ে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হওয়ার ঘটনা আমাদের বেশ চিন্তিত করে তোলে। যে শরীরচর্চা সুস্থ থাকার পথ, তা কেন জীবনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়? এর পেছনে রয়েছে কিছু নির্দিষ্ট কারণ এবং ভুল অভ্যাস। জিমে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার কারণগুলো বুঝতে পারাটা তাই এখন সময়ের দাবি। সঠিক সচেতনতা থাকলে আমরা সহজেই এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে পারি।
অতিরিক্ত বা ভুল ব্যায়াম: যা অজান্তেই ডেকে আনে বিপদ
জিমে কঠোর ব্যায়াম করার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই থাকে। দ্রুত ওজন কমাতে বা পেশী গড়তে আমরা অনেক সময় শরীরের সামর্থ্যের কথা ভুলে যাই। এটি হার্টের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে।
শরীরের ধারণক্ষমতার বাইরে ব্যায়াম
প্রতিটি মানুষের শরীরের নির্দিষ্ট একটি সহনশীলতা সীমা থাকে। হঠাৎ করে অনেক ভারী ওজন তোলা বা তীব্র গতিতে দৌড়ানো হার্টের ওপর প্রচণ্ড চাপ দেয়। যারা দীর্ঘদিন অলস জীবন কাটানোর পর হঠাৎ জিমে গিয়েই অতি-কঠোর ব্যায়াম শুরু করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি থাকে। হৃদপিণ্ড হঠাৎ এমন চাপের জন্য প্রস্তুত থাকে না, ফলে রক্ত সঞ্চালনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঘটনা ঘটতে পারে। শরীরকে ব্যায়ামের উপযোগী করে তুলতে ধাপে ধাপেIntensity বাড়াতে হয়, হুট করে নয়।
ভুল ব্যায়াম পদ্ধতি ও অঙ্গবিন্যাস
ব্যায়াম করার সঠিক কৌশল বা ফর্ম জানা অত্যন্ত জরুরি। ভুলভাবে ওজন তুললে বা ব্যায়ামের ভুল কৌশল অনুসরণ করলে শরীরের বিভিন্ন জয়েন্ট ও পেশীর ওপর তো চাপ পড়েই, সেই সাথে হৃৎপিণ্ডকেও অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। ভুল অঙ্গবিন্যাস শ্বাস-প্রশ্বাসের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন করে দেয়, যার ফলে শরীরে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায় কিন্তু সরবরাহ ঠিকমতো হয় না। এই অবস্থা দীর্ঘক্ষণ চললে হার্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, যা বিপজ্জনক হতে পারে।
ওয়ার্ম-আপ ও কুল-ডাউন না করা
ব্যায়াম শুরুর আগে গা গরম করা বা ওয়ার্ম-আপ করা হৃদপিণ্ডকে কঠিন পরিশ্রমের জন্য প্রস্তুত করে। এটি শরীর ও হৃদস্পন্দনকে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের উপযোগী করে তোলে। আবার ব্যায়াম শেষে হুট করে থেমে না গিয়ে কুল-ডাউন করা রক্তচাপকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। ওয়ার্ম-আপ ও কুল-ডাউন অবহেলা করলে হৃদস্পন্দনের হারে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, যা হৃদপিণ্ডের ওপর আকস্মিক আঘাত হিসেবে কাজ করতে পারে।
আগে থেকে থাকা হৃদরোগ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি
অনেকে মনে করেন সুস্থ বোধ করলেই তিনি শারীরিক পরিশ্রমের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিন্তু অনেক সময় শরীরে এমন কিছু রোগ লুকিয়ে থাকে, যা সাধারণ অবস্থায় বোঝা যায় না। জিমে কঠোর ব্যায়াম করার সময় এই গোপন রোগগুলোই হঠাৎ বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উপসর্গবিহীন হৃদরোগ
অনেক ব্যক্তির হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো খুব অস্পষ্ট থাকে বা একেবারেই বোঝা যায় না। একে সাইলেন্ট হার্ট ডিজিজ বা উপসর্গবিহীন হৃদরোগ বলা হয়। ধমনীতে সামান্য ব্লক বা হৃদপিণ্ডের গঠনগত ত্রুটি সাধারণ অবস্থায় সমস্যা করে না, কিন্তু যখন ব্যায়ামের সময় হার্টকে দ্রুত কাজ করতে হয়, তখন এই ধমনীগুলো পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ করতে পারে না। ফলে অক্সিজেন অভাবে হার্টের পেশী দুর্বল হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন এবং উচ্চ কোলেস্টেরল হলো হার্টের নীরব ঘাতক। যাদের রক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত, তাদের ধমনীগুলো শক্ত হয়ে যেতে পারে। এর ওপর যখন ব্যায়ামের ফলে রক্তচাপ আরও বেড়ে যায়, তখন রক্তনালীগুলো সেই চাপ সহ্য করতে না পেরে ফেটে যেতে পারে বা ব্লক হয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। ব্যায়ামের আগে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ডায়াবেটিস ও স্থূলতা
ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে স্নায়বিক সংবেদনশীলতা কম হতে পারে। এর ফলে ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি হলেও তারা তা ঠিকমতো অনুভব করতে পারেন না। এছাড়াও স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের হৃদপিণ্ডকে এমনিতেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কাজ করতে হয়। জিমে অতিরিক্ত ব্যায়াম তাদের হৃদপিণ্ডের ওপর ডাবল প্রেশার তৈরি করে, যা ঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠে।
জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস: যা হার্টের জন্য ক্ষতিকর
জিমে ব্যায়াম করলেই যে শরীর সবসময় সুস্থ থাকবে এমন নয়। আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো আমাদের কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। আপনি জিমে এক ঘণ্টা ঘাম ঝরাচ্ছেন, কিন্তু বাকি ২৩ ঘণ্টা কী করছেন, তা-ই ঠিক করে দেয় আপনার হার্ট কতটা নিরাপদ।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অতিরিক্ত তেল, চর্বি, লবণ এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার রক্তনালীতে চর্বি জমায়। এর ফলে ধমনী সরু হয়ে যায় এবং রক্ত প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এমন খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে জিমে গেলে রক্ত সঞ্চালনে বাড়তি বাধা তৈরি হয়। ব্যায়ামের ঠিক আগে বা পরে ভারী বা অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ হার্টের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে, যা ব্যায়ামের সময় হার্টের কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করে।
অপর্যাপ্ত ঘুম ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ
ঘুমের অভাব শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা রক্তচাপ এবং হৃদস্পন্দন উভয়ই বাড়িয়ে দেয়। ক্লান্তি ও মানসিক চাপের মধ্যে জিমে ব্যায়াম করলে শরীরের পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা কমে যায়। এটি হার্টের পেশীকে দুর্বল করে দেয় এবং ব্যায়ামের সময় হঠাৎ হার্টের ছন্দপতন ঘটাতে পারে।
ধূমপান ও মদ্যপান
ধূমপান সরাসরি হৃদপিণ্ডের রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে ফেলে। যারা নিয়মিত ধূমপান করেন, তাদের ব্যায়ামের সময় হৃদপিণ্ডে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক। মদ্যপান হৃদপিণ্ডের পেশীকে দুর্বল করে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে। ব্যায়ামের পাশাপাশি এই অভ্যাসগুলো হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে করণীয়: বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
জিমে ব্যায়াম করা শরীরের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, যদি সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করা যায়। কিছু নিয়ম মেনে চললে আপনি ঝুঁকি এড়িয়ে সুফল পেতে পারেন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা
জিমে কোনো ধরনের ভারী ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যাদের বয়স ৩৫ বছরের বেশি বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস আছে, তাদের জন্য ইসিজি (ECG), ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ট্রেডমিল টেস্ট (TMT) করিয়ে নেওয়া জরুরি। আপনার হার্ট কতটা চাপ নিতে পারবে, তা এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়।
ব্যায়ামের সঠিক পরিকল্পনা ও সঠিক পদ্ধতি
জিমে গিয়ে নিজে নিজে সব ব্যায়াম শুরু করবেন না। একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ট্রেইনারের তত্ত্বাবধানে ব্যায়াম করুন। আপনার শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী ট্রেইনার ব্যায়ামের চার্ট তৈরি করে দেবেন। প্রতিটি ব্যায়ামের সঠিক কৌশল বা ফর্ম মেনে চলুন। ব্যায়ামের সময় শ্বাস নেওয়ার পদ্ধতি সঠিক রাখুন। কোনো ব্যায়াম করতে গিয়ে অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ব্যথা অনুভব করলে তা জোর করে চালিয়ে যাবেন না।
শরীরের সংকেত শোনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিরতি
আপনার শরীর সবসময় আপনাকে সংকেত দেয়। ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম বা হঠাৎ দুর্বলতা বোধ করলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যায়াম বন্ধ করে দিন। অনেকেই 'নো পেইন, নো গেইন' এই ভুল ধারণায় কষ্ট সহ্য করে ব্যায়াম চালিয়ে যান। মনে রাখবেন, মাংসপেশীর ব্যথা আর হার্টের ব্যথা আলাদা। বুকের বাম পাশে বা মাঝখানে ব্যথা অনুভব করলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
সুষম খাদ্যাভ্যাস ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম
ব্যায়ামের পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন। প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার এবং পর্যাপ্ত প্রোটিন হার্টের জন্য ভালো। সারাদিন প্রচুর জল পান করুন। দিনের শেষে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন। ব্যায়ামের পর শরীরকে সুস্থ হতে পর্যাপ্ত সময় দিন, প্রতিদিন কঠোর ব্যায়াম না করে সপ্তাহে অন্তত একদিন পূর্ণ বিশ্রাম নিন।
উপসংহার
ব্যায়াম সুস্থ জীবনযাপনের মূল চাবিকাঠি, তবে সচেতনতা ছাড়া সব চেষ্টাই বিফলে যেতে পারে। জিমে হার্ট অ্যাটাকের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় যে, নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতা জানা কতটা জরুরি। অতিরিক্ত ব্যায়াম বা ভুল পদ্ধতি হৃদপিণ্ডের জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। নিয়মিত চেকআপ, সঠিক পুষ্টি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং ট্রেইনারের পরামর্শ মেনে চললে আপনি জিমে নিরাপদ থাকতে পারবেন। ব্যায়াম করার উদ্দেশ্য শরীরকে সুস্থ ও সুন্দর রাখা, তাকে বিপদের মুখে ফেলা নয়। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ নিন ভেবেচিন্তে এবং সুস্থ থাকুন।