চোখের ছানি (Cataract): লক্ষণ, কারণ, অপারেশন ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড
Published: October 3, 2026

বাংলাদেশে অন্ধত্বের সবচেয়ে বড় একক কারণ কোনো দুর্ঘটনা বা সংক্রমণ নয়—এটি চোখের ছানি (Cataract)। জাতীয় ব্লাইন্ডনেস ও লো ভিশন জরিপ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা IAPB-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ নতুন করে ছানি রোগে আক্রান্ত হন, এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সী প্রতি ১০ জনের একজনেরও বেশি মানুষ ছানির কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা অন্ধত্বে ভোগেন। সুখবর হলো, ছানি শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য না হলেও এটি সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য—সঠিক সময়ে অপারেশন করালে দৃষ্টিশক্তি প্রায় সম্পূর্ণভাবে ফিরে পাওয়া সম্ভব। এই গাইডে ছানির কারণ, লক্ষণ, ধরন, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
চোখের ছানি কী?
চোখের লেন্স (lens) হলো একটি স্বচ্ছ, নমনীয় গঠন যা আলোকে প্রতিসরণ করে রেটিনায় স্পষ্ট ছবি তৈরি করতে সাহায্য করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বা অন্য কোনো কারণে লেন্সের প্রোটিনগুলো জমাট বেঁধে মেঘলা বা অস্বচ্ছ হয়ে যেতে পারে—এই অবস্থাকেই বলা হয় ছানি বা ক্যাটার্যাক্ট। লেন্স যত বেশি অস্বচ্ছ হয়, আলো তত কম রেটিনায় পৌঁছায়, ফলে দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা হতে থাকে। এটি সাধারণত একটি ধীরগতির, ব্যথাহীন প্রক্রিয়া, তবে চিকিৎসা না করালে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অন্ধত্ব ডেকে আনতে পারে।
ছানি কেন হয়? প্রধান কারণ ও ঝুঁকির বিষয়
বয়স বৃদ্ধিই ছানির সবচেয়ে বড় ঝুঁকির কারণ—সাধারণত ৫০ বছরের পর থেকে এই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে থাকে। তবে আরও কিছু কারণ ছানির সৃষ্টি বা তীব্রতা বাড়াতে পারে:
- ডায়াবেটিস: দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত রক্তে শর্করার মাত্রা থাকলে স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় ডায়াবেটিস রোগীদের ছানি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় পাঁচ গুণ বেশি এবং এটি তুলনামূলক কম বয়সেই দেখা দিতে পারে।
- দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ট্যাবলেট বা আইড্রপ ব্যবহার করলে ছানির ঝুঁকি বাড়ে।
- অতিরিক্ত সূর্যালোক (UV-B) এক্সপোজার: সানগ্লাস ছাড়া দীর্ঘ সময় কড়া সূর্যালোকে কাজ করা।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান।
- চোখে আঘাত বা পূর্বে কোনো চোখের অপারেশন।
- পারিবারিক/জন্মগত কারণ: কিছু ক্ষেত্রে জিনগত কারণে বা মায়ের গর্ভাবস্থায় রুবেলা সংক্রমণের মতো কারণে শিশুরাও জন্মগত ছানি নিয়ে জন্মাতে পারে, যদিও এটি তুলনামূলক বিরল।
ছানির লক্ষণ
ছানির শুরুর দিকে প্রায়ই কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। রোগ বাড়ার সাথে সাথে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
- দৃষ্টি ধীরে ধীরে ঝাপসা বা মেঘলা হয়ে যাওয়া, যেন কুয়াশার ভেতর দিয়ে দেখা হচ্ছে।
- রাতে গাড়ি/রিকশা চালানো বা দেখতে কষ্ট হওয়া, আলোর চারপাশে বৃত্তাকার আভা (halo) বা তীব্র চকচকি (glare) অনুভব হওয়া।
- রঙের তীব্রতা বা উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া, সবকিছু কিছুটা ফ্যাকাশে বা হলুদাভ দেখানো।
- বারবার চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করতে হওয়া।
- এক চোখে দ্বিত্ব দৃষ্টি (double vision) দেখা।
- কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে কাছের লেখা পড়ার ক্ষমতা কিছুটা উন্নত মনে হওয়া (একে কখনও কখনও "সেকেন্ড সাইট" বলা হয়, তবে এটি সাময়িক এবং রোগ বাড়ার লক্ষণ)।
ছানির ধরন ও পর্যায়
লেন্সের কোন অংশে অস্বচ্ছতা তৈরি হচ্ছে তার ভিত্তিতে ছানিকে মূলত তিন ধরনে ভাগ করা হয়—নিউক্লিয়ার ছানি (লেন্সের মাঝের অংশে, বয়সজনিত ছানির সবচেয়ে সাধারণ ধরন), কর্টিক্যাল ছানি (লেন্সের বাইরের অংশে চাকার স্পোকের মতো দাগ তৈরি করে) এবং পোস্টেরিয়র সাবক্যাপসুলার ছানি (লেন্সের পেছনের দিকে, ডায়াবেটিস ও স্টেরয়েড ব্যবহারে বেশি দেখা যায় এবং দ্রুত বাড়ে)।
অগ্রগতির দিক থেকে ছানি সাধারণত চারটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়:
- প্রাথমিক/ইনসিপিয়েন্ট পর্যায়: লেন্সে অল্প অস্বচ্ছতা, দৃষ্টিতে সামান্য প্রভাব।
- ইমম্যাচিউর পর্যায়: লেন্স আরও মেঘলা হয়ে ওঠে, দৃষ্টি স্পষ্টভাবে কমতে থাকে, আলোয় চকচকি বাড়ে।
- ম্যাচিউর পর্যায়: সম্পূর্ণ লেন্স ঘন সাদাটে হয়ে যায়, দৃষ্টি তীব্রভাবে কমে যায়—এই পর্যায়েই সাধারণত অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- হাইপার-ম্যাচিউর পর্যায়: চিকিৎসা না করালে লেন্স আরও সংকুচিত বা তরলীভূত হয়ে যেতে পারে, যা চোখে প্রদাহ বা গ্লুকোমার মতো জটিল সমস্যা তৈরি করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ: আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ছানি "পেকে" যাওয়া বা সম্পূর্ণ ম্যাচিউর হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। দৃষ্টিশক্তি যখন দৈনন্দিন কাজ—পড়া, রান্না, গাড়ি/রিকশা চালানো—ব্যাহত করতে শুরু করে, তখনই অপারেশন করিয়ে নেওয়া উত্তম। দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে হাইপার-ম্যাচিউর পর্যায়ে গিয়ে অপারেশন তুলনামূলক জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নির্ণয় ও পরীক্ষা
একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে ছানি নির্ণয় করেন:
- ভিজ্যুয়াল অ্যাকুইটি টেস্ট: নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে চার্টের অক্ষর পড়ে দৃষ্টিশক্তির মাত্রা যাচাই করা হয়।
- স্লিট-ল্যাম্প পরীক্ষা: চোখের পিউপিল ড্রপ দিয়ে বড় করে বিশেষ মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে লেন্সের ঠিক কোন অংশে (নিউক্লিয়ার/কর্টিক্যাল/পোস্টেরিয়র সাবক্যাপসুলার) এবং কতটা ঘনত্বে অস্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে তা দেখা হয়। এর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে LOCS III বা জনস হপকিন্স গ্রেডিং সিস্টেমের মতো স্ট্যান্ডার্ড চার্ট ব্যবহার করা হয়, যেখানে তীব্রতা সাধারণত ১ থেকে ৪ গ্রেডে ভাগ করা হয়।
- গ্লেয়ার টেস্ট: উজ্জ্বল আলোতে দৃষ্টি কতটা কমে যায় তা পরীক্ষা করা হয়, কারণ ছানি থাকলে প্রখর আলোয় দৃষ্টি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি খারাপ হয়।
- প্রয়োজনে রেটিনার অবস্থা যাচাই এবং অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় লেন্স পাওয়ার মাপার জন্য অতিরিক্ত পরীক্ষা (যেমন বায়োমেট্রি) করা হয়।
চিকিৎসা: কখন অপারেশন প্রয়োজন
ছানির কোনো ওষুধ, আইড্রপ বা ভিটামিন নেই যা তৈরি হয়ে যাওয়া ছানি সারিয়ে দিতে পারে—এটি একটি সাধারণ ভুল ধারণা। প্রাথমিক পর্যায়ে চশমার পাওয়ার পরিবর্তন বা উজ্জ্বল আলোর ব্যবস্থা করে কিছুদিন কাজ চালানো সম্ভব হলেও, একমাত্র কার্যকর ও স্থায়ী চিকিৎসা হলো অস্ত্রোপচার। সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো ফ্যাকোইমালসিফিকেশন—এতে অতি ছোট একটি ছেদনের মাধ্যমে আল্ট্রাসাউন্ড শক্তি দিয়ে অস্বচ্ছ লেন্স ভেঙে বের করে সেখানে একটি কৃত্রিম ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স (IOL) স্থাপন করা হয়। এটি সাধারণত দিনের মধ্যেই (ডে-কেয়ার) সম্পন্ন হয় এবং সেলাইয়ের প্রয়োজন খুব কম ক্ষেত্রেই হয়।
অপারেশনের পর সাধারণত চিকিৎসক কিছুদিনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক, প্রদাহনাশক স্টেরয়েড (যেমন প্রেডনিসোলোন আইড্রপ) এবং প্রয়োজনে ব্যথা/প্রদাহ কমাতে NSAID আইড্রপ (যেমন কেটোরোল্যাক) দিয়ে থাকেন, পাশাপাশি চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া রোধে লুব্রিকেটিং আইড্রপ (আর্টিফিশিয়াল টিয়ার্স) ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এসব ওষুধ কড়াভাবে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী এবং নির্ধারিত মেয়াদেই ব্যবহার করা জরুরি; নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়।
অপারেশনের পর করণীয় ও বর্জনীয়
ছানি অপারেশন সাধারণত নিরাপদ ও স্বল্প সময়ের হলেও, সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম সপ্তাহ-দুই সপ্তাহে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি যাতে সংক্রমণ বা জটিলতা এড়ানো যায়:
- অপারেশনের পরপর চোখে পানি লাগানো, সাঁতার কাটা বা ধুলাবালিপূর্ণ পরিবেশে যাওয়া এড়িয়ে চলুন; গোসলের সময় চোখ বন্ধ রেখে সতর্কতার সাথে মুখ ধোয়া উচিত।
- চোখ ঘষা বা চাপ দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন; রাতে ঘুমানোর সময় ডাক্তারের দেওয়া প্রোটেক্টিভ শিল্ড বা চশমা ব্যবহার করুন যাতে অজান্তে চোখে চাপ না পড়ে।
- ভারী ওজন তোলা, ঝুঁকে কাজ করা বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম কয়েক সপ্তাহের জন্য এড়িয়ে চলুন, কারণ এতে চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে যেতে পারে।
- নির্ধারিত অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড ও লুব্রিকেটিং আইড্রপ ডাক্তারের নির্দেশিত সময় ও মাত্রায় সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করুন, মাঝপথে বন্ধ করবেন না।
- অপারেশনের পরদিন এবং তারপর ডাক্তারের দেওয়া সময়সূচি অনুযায়ী ফলো-আপ ভিজিটে যান, যাতে ক্ষত সারার অগ্রগতি ও IOL-এর অবস্থান ঠিকমতো যাচাই করা যায়।
- নতুন চশমার প্রয়োজন হলে সাধারণত চোখ সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর (৪-৬ সপ্তাহ পর) পাওয়ার পরীক্ষা করিয়ে বানানো উচিত।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন
- হঠাৎ এক বা দুই চোখে দৃষ্টি দ্রুত কমে যাওয়া (এটি সাধারণ ছানির চেয়ে বেশি জরুরি কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে)।
- চোখে ব্যথা, লালভাব বা মাথাব্যথার সাথে বমি বমি ভাব—এটি হাইপার-ম্যাচিউর ছানিজনিত জটিলতা (যেমন লেন্স-ইনডিউসড গ্লুকোমা) নির্দেশ করতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
- অপারেশনের পর চোখে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টি কমে যাওয়া বা অতিরিক্ত স্রাব দেখা দেওয়া।
কৃত্রিম লেন্স (IOL)-এর ধরন
অপারেশনে বসানো কৃত্রিম ইন্ট্রাঅকুলার লেন্সের একাধিক ধরন পাওয়া যায়, এবং কোনটি উপযুক্ত তা নির্ভর করে রোগীর চোখের অবস্থা, বাজেট ও প্রয়োজনের ওপর। সবচেয়ে প্রচলিত হলো মনোফোকাল লেন্স, যা একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে (সাধারণত দূরের) স্পষ্ট দৃষ্টি দেয়, ফলে কাছের কাজের জন্য আলাদা চশমা প্রয়োজন হতে পারে। মাল্টিফোকাল বা ট্রাইফোকাল লেন্স দূর ও কাছ—দুই ক্ষেত্রেই দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করে, ফলে অনেকেই অপারেশনের পর চশমা ছাড়াই চলতে পারেন। আবার যাদের চোখে সিলিন্ড্রিক্যাল পাওয়ার বা অ্যাস্টিগম্যাটিজম আছে, তাদের জন্য টরিক লেন্স ব্যবহার করা হয়। কোন লেন্স উপযুক্ত তা চক্ষু বিশেষজ্ঞ রোগীর চোখের বায়োমেট্রি পরীক্ষার ফল ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরামর্শ দেন।
বিশেষ বিবেচনা: ডায়াবেটিস, বয়স্ক ও শিশু
ডায়াবেটিস রোগীদের ছানি অপারেশনের আগে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি, কারণ অনিয়ন্ত্রিত শর্করা ক্ষত শুকানো ও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়; পাশাপাশি তাদের নিয়মিত (সাধারণত বছরে একবার) চোখ পরীক্ষা করানো উচিত, কারণ তাদের মধ্যে ছানি দ্রুত ও কম বয়সে বিকশিত হতে পারে। বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপের মতো সহ-অসুস্থতা থাকলে অপারেশনের আগে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা মূল্যায়ন করা হয়, তবে বয়স নিজে কখনোই অপারেশনের বাধা নয়—৮০-৯০ বছর বয়সেও সফলভাবে ছানি অপারেশন করা সম্ভব। শিশুদের জন্মগত ছানি ধরা পড়লে তা দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি, কারণ দেরি হলে শিশুর দৃষ্টি স্থায়ীভাবে দুর্বল (অ্যাম্বলায়োপিয়া) হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ছানি বনাম গ্লুকোমা: পার্থক্য বোঝা জরুরি
অনেকেই ছানি ও গ্লুকোমাকে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সমস্যা। ছানিতে লেন্স মেঘলা হয়ে পুরো দৃষ্টিক্ষেত্র ধীরে ধীরে, ব্যথাহীনভাবে ঝাপসা হয়ে যায় এবং অপারেশনে সম্পূর্ণ সেরে যায়। গ্লুকোমায় চোখের ভেতরের চাপ বেড়ে অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সাধারণত পাশের (পেরিফেরাল) দৃষ্টি থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে কমায় এবং একবার ক্ষতি হলে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না—শুধু আরও ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। দুটি সমস্যা একই রোগীর মধ্যে একসাথেও থাকতে পারে, তাই নিয়মিত চোখ পরীক্ষায় দুটোই যাচাই করা জরুরি।
প্রতিরোধ: ছানির ঝুঁকি কীভাবে কমাবেন
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: রক্তে শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করে লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখুন।
- UV সুরক্ষা: বাইরে বের হলে এমন সানগ্লাস পরুন যা UV-A ও UV-B উভয় রশ্মি প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করে।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান এড়িয়ে চলুন।
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার: ভিটামিন সি ও ই, লুটেইন, জিয়াজ্যান্থিন সমৃদ্ধ টাটকা ফল (লেবু, পেয়ারা, কমলা) ও শাকসবজি (পালং, লালশাক, গাজর) নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখুন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ভিটামিন সি গ্রহণ ১০ বছরে ছানির অগ্রগতি প্রায় ৩৩% কমাতে সাহায্য করতে পারে।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েড ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।
- চোখে আঘাত থেকে সুরক্ষা: কাজ বা খেলার সময় প্রয়োজনে প্রোটেক্টিভ গ্লাস ব্যবহার করুন।
- ৪০ বছর বয়সের পর থেকে নিয়মিত (অন্তত ১-২ বছরে একবার) চোখের পরীক্ষা করান, যাতে ছানি বা অন্য কোনো চোখের সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে।
বাংলাদেশে ছানি অপারেশনের সুযোগ
বাংলাদেশে ছানি অপারেশনের খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই—জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIOH) এবং সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে স্বল্প খরচে বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধত্ব প্রতিরোধ সমিতি (BNSB), স্যান্দানী, লায়ন্স আই হাসপাতাল এবং ফ্রেড হলোস ফাউন্ডেশনের মতো সংগঠন দেশের বিভিন্ন উপজেলায় নিয়মিত বিনামূল্যে চক্ষু শিবির (eye camp) আয়োজন করে, যেখানে প্রতিটি শিবিরে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার রোগীকে স্ক্রিনিং করে উপযুক্তদের বিনামূল্যে ছানি অপারেশনের ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা হাসপাতাল থেকে এই শিবিরগুলোর তথ্য পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় ব্লাইন্ডনেস ও লো ভিশন জরিপ, আন্তর্জাতিক সংস্থা IAPB-এর বাংলাদেশ চক্ষুসেবা মূল্যায়ন প্রতিবেদন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও যুক্তরাষ্ট্রের National Eye Institute (NEI)-এর নির্দেশিকা অনুসরণে লেখা।
Frequently Asked Questions
চোখের ছানি কি নিজে থেকে সেরে যেতে পারে বা কোনো ড্রপ/ওষুধে ভালো হয়?
ছানি অপারেশনের জন্য কি ছানি সম্পূর্ণ "পেকে" যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়?
ছানি অপারেশনে কি ব্যথা হয় এবং সুস্থ হতে কত সময় লাগে?
ডায়াবেটিস থাকলে ছানি অপারেশন করা কি নিরাপদ?
ছানি ও গ্লুকোমা কি একই রোগ?
বাংলাদেশে ছানি অপারেশন কোথায় কম খরচে বা বিনামূল্যে করা যায়?
ছানি প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর অভ্যাস কী?
অপারেশনের পর কি দুই চোখেই একসাথে ছানি অপারেশন করা হয়?
Comments
No comments yet. Be the first to comment.
Leave a comment
Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.


