osudhkosh
New

গেঁটেবাত (গাউট): লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসের সম্পূর্ণ গাইড

Published: October 17, 2026

Share:
গেঁটেবাত (গাউট): লক্ষণ, কারণ, চিকিৎসা ও খাদ্যাভ্যাসের সম্পূর্ণ গাইড

হঠাৎ রাতের মাঝামাঝি ঘুম ভেঙে যায় বুড়ো আঙুলে অসহ্য ব্যথায়—আঙুল লাল, ফোলা, ছোঁয়াও যাচ্ছে না। এটাই গেঁটেবাত বা গাউট-এর সবচেয়ে পরিচিত চেহারা। রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা ৭ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি হলেই তাকে উচ্চ (হাইপারইউরিসেমিয়া) ধরা হয়, আর দীর্ঘদিন এই মাত্রা বেশি থাকলে জয়েন্টে ইউরেট ক্রিস্টাল জমে গেঁটেবাতের আক্রমণ শুরু হয়। বাংলাদেশে এই রোগের নির্দিষ্ট জরিপ-তথ্য এখনও সীমিত, কিন্তু চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ বলছে—লাল মাংস, অর্গান মিট, ডাল ও সামুদ্রিক খাবারে ভরপুর খাদ্যাভ্যাস এবং খাবার নিয়ে সচেতনতার অভাবে এই সমস্যা ক্রমেই বাড়ছে। সঠিক তথ্য জানা থাকলে এই রোগ সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

গেঁটেবাত কী এবং কেন হয়?

আমাদের শরীরে পিউরিন নামক উপাদান ভেঙে ইউরিক এসিড তৈরি হয়—এই পিউরিন আসে শরীরের নিজের কোষ থেকে এবং কিছু খাবার থেকেও। স্বাভাবিক অবস্থায় কিডনি এই ইউরিক এসিড প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিন্তু দুটি কারণে রক্তে এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে—শরীরে অতিরিক্ত ইউরিক এসিড তৈরি হওয়া, বা কিডনি তা পর্যাপ্তভাবে বের করতে না পারা। মাত্রা বেশি দিন ধরে বেশি থাকলে সূচের মতো তীক্ষ্ণ মনোসোডিয়াম ইউরেট (MSU) ক্রিস্টাল জয়েন্টের ভেতরে জমতে থাকে, আর শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই ক্রিস্টালকে আক্রমণ করলেই হয় তীব্র প্রদাহ, ফোলা ও ব্যথা—এটাই গেঁটেবাতের আক্রমণ।

কাদের ঝুঁকি বেশি?

  • স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন—মোটা মানুষদের রক্তে ইউরিক এসিডের মাত্রা সাধারণত বেশি থাকে
  • অ্যালকোহল, বিশেষ করে বিয়ার জাতীয় পানীয়
  • কিডনি রোগ বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া
  • থাইরয়েডের সমস্যা
  • কিছু ওষুধ, যেমন কিছু ডায়ুরেটিক (প্রস্রাবের ওষুধ), যা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করা হয়
  • ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালীন কোষ ভাঙনের হার বেড়ে যাওয়া
  • পারিবারিক ইতিহাস—পরিবারে কারও গেঁটেবাত থাকলে ঝুঁকি বেশি
  • পুরুষদের মধ্যে এবং মেনোপজ-পরবর্তী নারীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়

লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন?

গেঁটেবাতের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রথম আক্রমণ হয় পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়ার জয়েন্টে (এই অবস্থাকে বলা হয় "পোডাগ্রা")। সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • আক্রমণ প্রায়ই শুরু হয় রাতের শেষভাগে বা ভোরে, ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়ার মতো তীব্র ব্যথায়
  • আক্রান্ত জয়েন্ট লাল হয়ে ফুলে যায়, স্পর্শ করলেই প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয়—এমনকি চাদরের স্পর্শও সহ্য হয় না
  • চিকিৎসা ছাড়াই সাধারণত ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে ব্যথা কমে যায়
  • বুড়ো আঙুল ছাড়াও গোড়ালি, হাঁটু, কনুই বা কব্জির জয়েন্টেও আক্রমণ হতে পারে

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সারা শরীরে বা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ব্যথা হওয়া সাধারণত ইউরিক এসিড বাড়ার লক্ষণ নয়—গেঁটেবাত নির্দিষ্ট একটি বা দুটি জয়েন্টে আক্রমণ করে, বিশেষ করে শুরুতে।

জটিলতা ও বিপদ চিহ্ন

চিকিৎসা না করালে বা দীর্ঘদিন ইউরিক এসিড বেশি থাকলে কয়েকটি গুরুতর জটিলতা হতে পারে:

  • টোফাই: জয়েন্টের চারপাশে বা ত্বকের নিচে ইউরেট ক্রিস্টালের শক্ত পিণ্ড জমা হওয়া
  • দীর্ঘস্থায়ী জয়েন্টের ক্ষতি: বারবার আক্রমণে জয়েন্ট স্থায়ীভাবে বিকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
  • কিডনিতে পাথর: উচ্চ ইউরিক এসিড কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়

যদি জয়েন্টের ব্যথার সাথে জ্বর, কাঁপুনি বা জয়েন্ট অস্বাভাবিক গরম ও লালচে হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো জরুরি—কারণ এটি জয়েন্টে সংক্রমণ (সেপটিক আর্থ্রাইটিস) হতে পারে, যা গেঁটেবাতের সাথে সহজেই গুলিয়ে যায় কিন্তু জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

নির্ণয়: কোন পরীক্ষা করা হয়?

গেঁটেবাত নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো আক্রান্ত জয়েন্ট থেকে তরল নিয়ে পোলারাইজড মাইক্রোস্কোপে মনোসোডিয়াম ইউরেট ক্রিস্টাল পরীক্ষা করা—এটি পেলে নিশ্চিতভাবেই গেঁটেবাত বলা যায়। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়:

  • রক্তে সিরাম ইউরিক এসিড পরীক্ষা: ৭ mg/dL-এর বেশি হলে উচ্চ ধরা হয়, তবে আক্রমণের সময় এই মাত্রা স্বাভাবিকও থাকতে পারে—তাই একক রিপোর্টে রোগ বাদ দেওয়া যায় না
  • জয়েন্ট ফ্লুইড অ্যাসপিরেশন: সন্দেহ হলে ও সম্ভব হলে জয়েন্টের তরল পরীক্ষা করে ক্রিস্টাল খোঁজা
  • এক্স-রে বা আল্ট্রাসনোগ্রাফি: দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে জয়েন্টে ক্ষয় বা ইউরেট জমার ছাপ দেখতে
  • কিডনির কার্যক্ষমতা পরীক্ষা (ক্রিয়েটিনিন): কিডনি কতটা ইউরিক এসিড বের করতে পারছে বোঝার জন্য

বিশেষজ্ঞদের তৈরি ACR/EULAR শ্রেণীবিভাগ মানদণ্ড অনুযায়ী বিভিন্ন লক্ষণ, পরীক্ষার ফল ও ইমেজিং-এর ভিত্তিতে একটি স্কোর হিসাব করা হয়; মোট স্কোর ৮ বা তার বেশি হলে তা গেঁটেবাত হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়। এতে সিরাম ইউরিক এসিড ১০ mg/dL বা তার বেশি থাকলে আলাদাভাবে ৪ পয়েন্ট যোগ হয়। তবে এই স্কোরিং মূলত গবেষণা ও শ্রেণীবিভাগের জন্য তৈরি—ব্যক্তিগত রোগনির্ণয়ের সিদ্ধান্ত চিকিৎসকই নেবেন।

গেঁটেবাত বনাম অন্য জয়েন্টের ব্যথা

গেঁটেবাতকে প্রায়ই সিউডোগাউট (ক্যালসিয়াম পাইরোফসফেট ক্রিস্টাল ডিপোজিশন বা CPPD) নামের আরেকটি রোগের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়, কারণ দুটোতেই জয়েন্ট ফুলে ব্যথা করে। পার্থক্যগুলো মনে রাখার মতো:

  • গেঁটেবাতে ইউরিক এসিড ক্রিস্টাল জমে, সিউডোগাউটে ক্যালসিয়াম পাইরোফসফেট ক্রিস্টাল জমে—দুটো সম্পূর্ণ আলাদা উপাদান
  • গেঁটেবাত বেশিরভাগ সময় বুড়ো আঙুলে হয়; সিউডোগাউট সাধারণত হাঁটু, কব্জি বা কাঁধে হয়, বুড়ো আঙুলে কম দেখা যায়
  • গেঁটেবাতের আক্রমণ সাধারণত দুই সপ্তাহের মধ্যে কমে যায়; চিকিৎসা না করালে সিউডোগাউট কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসও চলতে পারে
  • গেঁটেবাতে অ্যালকোহল, নির্দিষ্ট খাবার বা পানিশূন্যতার মতো স্পষ্ট ট্রিগার থাকে; সিউডোগাউটে সাধারণত এমন নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না

দুটোর মধ্যে পার্থক্য নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ফ্লুইডে ক্রিস্টাল পরীক্ষাই সবচেয়ে ভালো উপায়, এবং এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা রিউমাটোলজিস্টের নেওয়া উচিত।

চিকিৎসা: তীব্র আক্রমণে করণীয়

তীব্র আক্রমণের সময় লক্ষ্য থাকে ব্যথা ও প্রদাহ কমানো। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত ব্যবহার করা হয়—NSAID গোত্রের ব্যথানাশক, কম মাত্রার কলচিসিন, বা প্রয়োজনে কর্টিকোস্টেরয়েড। তিনটি পদ্ধতিই তীব্র আক্রমণে কার্যকর বলে বিবেচিত, তবে কলচিসিন আক্রমণের শুরুতেই নিলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। ব্যথা শুরুর সাথে সাথে বিশ্রাম নেওয়া, আক্রান্ত জয়েন্ট উঁচুতে রাখা এবং বরফ দেওয়া সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু কোনো ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়, বিশেষ করে কিডনি বা পেটের সমস্যা থাকলে।

দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা: ইউরিক এসিড কমানোর ওষুধ

যাদের বছরে একাধিকবার আক্রমণ হয়, টোফাই আছে, কিডনিতে পাথর হয়েছে বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেছে—তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক দীর্ঘমেয়াদী ইউরিক এসিড-কমানোর ওষুধ (urate-lowering therapy) শুরু করার পরামর্শ দিতে পারেন। এই বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • অ্যালোপিউরিনল সাধারণত প্রথম সারির ওষুধ, কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রেও। চিকিৎসকরা সাধারণত কম মাত্রায় শুরু করে ধীরে ধীরে মাত্রা বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছান
  • দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় বংশোদ্ভূত মানুষদের ক্ষেত্রে অ্যালোপিউরিনল শুরুর আগে কিছু আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় একটি জিনগত পরীক্ষার (HLA-B*5801) পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ এই জনগোষ্ঠীতে গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি বলে উল্লেখ আছে—বাংলাদেশের রোগীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা ভালো
  • ফেবুক্সোস্ট্যাট দ্বিতীয় সারির বিকল্প, মূলত যখন অ্যালোপিউরিনল সহ্য হয় না বা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানো যায় না। হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে এই ওষুধ সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হয়
  • ইউরিক এসিড কমানোর ওষুধ শুরু করার প্রথম কিছু সপ্তাহে উল্টো আক্রমণ বেড়ে যেতে পারে—এই কারণে চিকিৎসক প্রায়ই সাথে কম মাত্রার কলচিসিন বা NSAID কয়েক মাস ধরে দিয়ে রাখেন
  • এই ওষুধগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী বা জীবনভর চালিয়ে যেতে হয়—ব্যথা কমে গেলেই নিজে থেকে বন্ধ করলে ইউরিক এসিড আবার বেড়ে যেতে পারে

বাংলাদেশে অ্যালোপিউরিনল (যেমন Duric, Aluric, Alurol, Goutex নামে পরিচিত ব্র্যান্ড), ফেবুক্সোস্ট্যাট (Fostat, Goutil, Febulas-এর মতো ব্র্যান্ড) এবং কলচিসিন (Colimax, Coluric, Kolchin-এর মতো ব্র্যান্ড) স্থানীয় ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। তবে কোন ওষুধ, কোন মাত্রায়, কতদিন খাবেন—এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের উপর নির্ভর করা উচিত; নিজে নিজে এই তালিকা থেকে কোনো ওষুধ বেছে নেওয়া উচিত নয়।

লক্ষ্যমাত্রা ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ

দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার লক্ষ্য হলো রক্তে ইউরিক এসিডকে এমন একটি মাত্রার নিচে রাখা, যাতে জমে থাকা ক্রিস্টাল ধীরে ধীরে গলে যায় এবং নতুন আক্রমণ আর না হয়—চিকিৎসকরা একে "ট্রিট-টু-টার্গেট" পদ্ধতি বলেন। এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা এবং ওষুধের মাত্রা প্রতি কয়েক সপ্তাহে যাচাই করে প্রয়োজনমতো বাড়ানো-কমানো হয়, যতক্ষণ না কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় স্থিতিশীল হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের ফলোআপ অপরিহার্য—ওষুধ শুরু করে নিজের মতো বন্ধ করে দিলে বা মাত্রা বদলে ফেললে চিকিৎসা ব্যর্থ হতে পারে এবং আক্রমণ আবার ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে।

প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

অনেকের মধ্যে ধারণা আছে যে গেঁটেবাত হলে সব ধরনের ডাল ও শাকসবজি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে—গবেষণার তথ্য বলছে, পিউরিনযুক্ত সবজি বা ডালের সাথে ইউরিক এসিড বাড়ার স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, যতটা লাল মাংস ও নির্দিষ্ট সামুদ্রিক মাছের সাথে পাওয়া গেছে। আরেকটি ভুল ধারণা হলো ব্যথা একবার কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া যায়—বাস্তবে ইউরিক এসিড-কমানোর ওষুধ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী চালিয়ে যেতে হয়, কারণ এটি বন্ধ করলে মাত্রা আবার বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া "ব্যথা কম তাই সমস্যা কম গুরুতর" ভাবাও ঠিক নয়—নিয়মিত মাত্রা বেশি থাকলে উপসর্গ ছাড়াই জয়েন্ট ও কিডনির ক্ষতি হতে পারে, এই কারণেই নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি।

খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন

খাবার একাই গেঁটেবাত সারাতে পারে না, কিন্তু কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে প্রমাণিত:

  • এড়িয়ে চলুন বা সীমিত করুন: অর্গান মিট (লিভার, কিডনি, মগজ)—এতে পিউরিনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি; রেড মিট; অ্যাঙ্কোভি, সার্ডিন, হেরিং, ম্যাকেরেলের মতো কিছু সামুদ্রিক মাছ; চিংড়ি-কাঁকড়া-লবস্টার মাঝারি মাত্রায় সীমিত রাখা ভালো
  • বিয়ার ও মিষ্টি পানীয়: বিয়ার এবং উচ্চ-ফ্রুক্টোজ চিনিযুক্ত পানীয় ইউরিক এসিড বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে বলে প্রমাণ আছে
  • পর্যাপ্ত পানি পান: পানি কম খেলে ইউরিক এসিড জমে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, তাই দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি
  • সহায়ক অভ্যাস: কম-চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার, পর্যাপ্ত ভিটামিন সি এবং পরিমিত কফি পানের সাথে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সম্পর্ক দেখা গেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্থূল ব্যক্তিদের মধ্যে ইউরিক এসিডের মাত্রা সাধারণত বেশি থাকে, তাই ধীরে ধীরে ওজন কমানো সহায়ক—কিন্তু অতি দ্রুত ওজন কমানো (ক্র্যাশ ডায়েট) বরং আক্রমণ উসকে দিতে পারে
  • ডাল-সবজি: কিছু সবজি ও ডালে পিউরিন থাকলেও গবেষণায় এদের সাথে গেঁটেবাতের ঝুঁকি বাড়ার স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি, যতটা লাল মাংস ও সামুদ্রিক খাবারে পাওয়া গেছে—তাই ডাল সম্পূর্ণ বর্জনের চেয়ে পরিমিত খাওয়াই যুক্তিযুক্ত

বিশেষ বিবেচনা

কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে: যাদের কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেছে, তাদের ওষুধের মাত্রা সাবধানে ঠিক করতে হয় এবং নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা জরুরি। বয়স্কদের ক্ষেত্রে: ডায়ুরেটিক ওষুধ সেবনকারী বয়স্ক রোগীদের মধ্যে গেঁটেবাতের ঝুঁকি বেশি থাকে, এবং একাধিক ওষুধ সেবনের কারণে নতুন ওষুধ সংযোজনের আগে ইন্টারঅ্যাকশন যাচাই জরুরি। হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে: ফেবুক্সোস্ট্যাটের মতো ওষুধ ইসকেমিক হৃদরোগ থাকলে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হয়। যেকোনো ক্ষেত্রেই আত্ম-চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা সবচেয়ে নিরাপদ।

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন

  • জয়েন্টের ব্যথার সাথে জ্বর বা কাঁপুনি থাকলে
  • এক বছরে একাধিকবার আক্রমণ হলে
  • জয়েন্টের চারপাশে শক্ত পিণ্ড (টোফাই) দেখা দিলে
  • প্রস্রাবে রক্ত বা তীব্র কোমর-পেটে ব্যথা হলে (কিডনিতে পাথরের সম্ভাব্য লক্ষণ)
  • বাসায় ব্যথানাশক খাওয়ার পরও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উপসর্গ না কমলে

গেঁটেবাত একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ—সঠিক সময়ে নির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ এবং খাদ্যাভ্যাসে সচেতন পরিবর্তন আনলে এই রোগ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

তথ্যসূত্র: আমেরিকান কলেজ অব রিউমাটোলজি (ACR) ও ইউরোপিয়ান অ্যালায়েন্স অব অ্যাসোসিয়েশনস ফর রিউমাটোলজি (EULAR)-র গাউট শ্রেণীবিভাগ ও চিকিৎসা নির্দেশিকা, যুক্তরাজ্যের NICE নির্দেশিকা এবং দেশীয় স্বাস্থ্য সাংবাদিকতার প্রতিবেদন অনুসরণে লেখা।

Frequently Asked Questions

ইউরিক এসিডের স্বাভাবিক মাত্রা কত, কত হলে বিপজ্জনক?
সাধারণত রক্তে সিরাম ইউরিক এসিড ৭ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটারের বেশি হলে তা উচ্চ বা হাইপারইউরিসেমিয়া ধরা হয়। তবে একবার মাত্রা বেশি পাওয়া মানেই গেঁটেবাত নিশ্চিত নয়, এবং আক্রমণের সময় মাত্রা স্বাভাবিকও থাকতে পারে—চিকিৎসক লক্ষণ ও অন্য পরীক্ষার সাথে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
গেঁটেবাতের প্রথম লক্ষণ কী এবং কোথায় সাধারণত হয়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে (প্রায় ৮০ শতাংশ) প্রথম আক্রমণ হয় পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়ায়, যা হঠাৎ রাতের শেষভাগে লাল হয়ে ফুলে প্রচণ্ড ব্যথা করে। সাধারণত ৭-১৪ দিনের মধ্যে এই ব্যথা নিজে থেকেই কমে যায়।
গেঁটেবাত ও সিউডোগাউট কি একই রোগ?
না। গেঁটেবাতে ইউরিক এসিড ক্রিস্টাল জমে, আর সিউডোগাউটে ক্যালসিয়াম পাইরোফসফেট ক্রিস্টাল জমে। গেঁটেবাত সাধারণত বুড়ো আঙুলে হয় ও দুই সপ্তাহে কমে যায়; সিউডোগাউট সাধারণত হাঁটু-কব্জিতে হয় ও কয়েক সপ্তাহ-মাস থাকতে পারে। নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ফ্লুইড পরীক্ষা প্রয়োজন।
গেঁটেবাত হলে কি সারাজীবন ওষুধ খেতে হবে?
যাদের বারবার আক্রমণ হয়, টোফাই আছে বা কিডনিতে পাথর হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ইউরিক এসিড-কমানোর ওষুধ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদী বা জীবনভর চালিয়ে যেতে হয়, কারণ বন্ধ করলে মাত্রা আবার বেড়ে যেতে পারে। সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত চিকিৎসকই নেবেন।
কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
অর্গান মিট (লিভার, কিডনি, মগজ), রেড মিট, অ্যাঙ্কোভি-সার্ডিন-হেরিং-ম্যাকেরেলের মতো মাছ এবং বিয়ার ও উচ্চ-ফ্রুক্টোজ চিনিযুক্ত পানীয় সীমিত করা উচিত। ডাল-সবজির সাথে ইউরিক এসিড বাড়ার স্পষ্ট প্রমাণ কম, তাই এগুলো সম্পূর্ণ বর্জনের প্রয়োজন সাধারণত নেই।
পানি কম খেলে কি ইউরিক এসিড বাড়ে?
হ্যাঁ, পর্যাপ্ত পানি না খেলে কিডনি ইউরিক এসিড বের করতে কষ্ট পায় এবং এটি জমে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা গেঁটেবাত প্রতিরোধে সহায়ক।
গেঁটেবাতের কারণে কি কিডনিতে পাথর হতে পারে?
হ্যাঁ, দীর্ঘদিন রক্তে ইউরিক এসিড বেশি থাকলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। প্রস্রাবে রক্ত বা তীব্র কোমর-পেটে ব্যথা হলে দ্রুত ডাক্তার দেখানো জরুরি।
ইউরিক এসিড কমানোর ওষুধ শুরু করলেই কি নতুন আক্রমণ হতে পারে?
হ্যাঁ, চিকিৎসা শুরুর প্রথম কিছু সপ্তাহে শরীরে ইউরেট ক্রিস্টালের পরিবর্তনের কারণে সাময়িকভাবে আক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। এই কারণে চিকিৎসক প্রায়ই সাথে কম মাত্রার কলচিসিন বা ব্যথানাশক কয়েক মাস দিয়ে রাখেন।
Share:

Comments

No comments yet. Be the first to comment.

Leave a comment

Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.

Never published

Published after review.

More news