খাবার স্যালাইন (ORS): সঠিক নিয়ম, মাত্রা ও ব্যবহারের সম্পূর্ণ গাইড
Published: September 28, 2026

বাংলাদেশে প্রতি বছর ডায়রিয়া, বমি বা ডেঙ্গুর মতো জ্বরে পানিশূন্যতায় (ডিহাইড্রেশন) আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন লক্ষাধিক মানুষ, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা। অথচ এই সমস্যার সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর সমাধানটি এসেছে খোদ ঢাকা থেকেই। ১৯৬৮ সালে ঢাকার icddr,b (তৎকালীন Cholera Research Laboratory)-এর গবেষকরা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেন যে মুখে খাওয়ার মাধ্যমে গ্লুকোজ-লবণের একটি নির্দিষ্ট মিশ্রণ দিয়েই তীব্র ডায়রিয়ার কারণে হওয়া পানিশূন্যতা সামলানো সম্ভব — শিরায় স্যালাইন (IV) ছাড়াই। বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল দ্য ল্যানসেট ১৯৭৮ সালে এই আবিষ্কারকে বিংশ শতাব্দীর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-আবিষ্কার বলে অভিহিত করে। গত কয়েক দশকে খাবার স্যালাইন বা ORS (Oral Rehydration Salt) বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৫ কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, আর বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ডায়রিয়াজনিত মৃত্যুহার ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রতি হাজার জীবিত জন্মে ১৫.১ থেকে কমে ৬.০-তে নেমে এসেছে। তবু ভুল নিয়মে স্যালাইন বানানো বা খাওয়ানোর কারণে প্রতি বছরই অনেক পরিবার বিপদে পড়ে। এই গাইডে জানুন খাবার স্যালাইন সঠিকভাবে বানানো, খাওয়ার সঠিক মাত্রা, সাধারণ ভুল ও কখন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
উল্লেখ্য, icddr,b-এর এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া মার্কিন গবেষক রিচার্ড ক্যাশ ১৯৬৭ সালে ঢাকায় আসেন এবং সহকর্মীদের নিয়ে দেখান যে এই সহজ মিশ্রণের উৎপাদন খরচ প্রায় নগণ্য, অথচ এর জন্য কোনো হাসপাতাল বা জটিল যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না — যেকোনো ঘরেই তা বানানো সম্ভব। এই কারণেই স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে খাবার স্যালাইন আজও ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু ঠেকানোর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।
খাবার স্যালাইন আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করে
খাবার স্যালাইন হলো গ্লুকোজ ও নির্দিষ্ট মাত্রার লবণের (ইলেকট্রোলাইট) একটি বৈজ্ঞানিক মিশ্রণ, যা ডায়রিয়া বা বমির কারণে শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি ও লবণ দ্রুত পুনরায় পূরণ করে। এর কার্যকারিতার পেছনে রয়েছে একটি সহজ শারীরবৃত্তীয় নীতি: অন্ত্রের ভেতরের আবরণে থাকা সোডিয়াম-গ্লুকোজ কো-ট্রান্সপোর্টার (SGLT1) নামক একটি প্রক্রিয়া গ্লুকোজের সাথে সোডিয়ামকে একসাথে শরীরে শোষণ করে নেয়, আর সোডিয়ামের সাথে সাথে পানিও শোষিত হয়। এই কারণেই শুধু পানি খাওয়ালে যতটা কাজ হয় না, ঠিক মাত্রায় গ্লুকোজ-লবণ মেশানো পানি খাওয়ালে তার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরভাবে পানিশূন্যতা ঠেকানো যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ ২০০৪-২০০৫ সাল থেকে যে নিম্ন-অসমোলারিটি (low-osmolarity) ফর্মুলাটি অনুমোদন করেছে, তাতে প্রতি ১ লিটার পানিতে থাকে: সোডিয়াম ক্লোরাইড ২.৬ গ্রাম, অ্যানহাইড্রাস গ্লুকোজ ১৩.৫ গ্রাম, পটাশিয়াম ক্লোরাইড ১.৫ গ্রাম এবং ট্রাইসোডিয়াম সাইট্রেট ডাইহাইড্রেট ২.৯ গ্রাম — মোট অসমোলারিটি ২৪৫ mOsm/L। আগের তুলনায় কম ঘনত্বের এই ফর্মুলা শিশুদের ক্ষেত্রে বমি কমায় এবং পাতলা পায়খানার পরিমাণ ও স্থায়িত্ব উভয়ই কমাতে সাহায্য করে।
কখন খাবার স্যালাইন খাওয়া দরকার
- তীব্র ডায়রিয়া (ঘন ঘন পাতলা পায়খানা)
- বমি হতে থাকলে, বিশেষ করে বমির সাথে পাতলা পায়খানা একসাথে হলে
- প্রচণ্ড গরমে অতিরিক্ত ঘামের কারণে পানিশূন্যতার আশঙ্কা থাকলে
- জ্বরজনিত অসুস্থতায় (যেমন ডেঙ্গু জ্বরে) শরীরে পর্যাপ্ত তরল ধরে রাখতে — তবে ডেঙ্গুতে জ্বর ও প্লাটিলেট পরিস্থিতি একজন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানেই মূল্যায়ন হওয়া উচিত
মনে রাখা জরুরি, খাবার স্যালাইন ডায়রিয়া বা রোগের কারণ সারায় না — এটি শুধু শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করে, যাতে শরীর নিজে থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে সময় ও শক্তি পায়।
সঠিক নিয়মে খাবার স্যালাইন বানানোর পদ্ধতি
বাজারের প্যাকেট স্যালাইন: বাংলাদেশে পাওয়া যাওয়া সাধারণ প্যাকেট স্যালাইন (যেমন ১০.২৫ গ্রামের সাশে) সাধারণত আধা লিটার (৫০০ মিলিলিটার) বিশুদ্ধ পানিতে সম্পূর্ণ প্যাকেটের গুঁড়ো মিশিয়ে বানাতে হয় — এখানে ভুল ধারণা থেকে অনেকে পুরো ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ফেলেন, যাতে দ্রবণ পাতলা হয়ে কার্যকারিতা কমে যায়। তাই প্যাকেটের গায়ে লেখা নির্দেশনা সবসময় ভালো করে পড়ে নিন, কারণ ব্র্যান্ডভেদে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
ঘরে বানানো স্যালাইন (জরুরি বিকল্প হিসেবে): প্যাকেট স্যালাইন হাতের কাছে না থাকলে সাময়িকভাবে ঘরেও বানানো যায় — ১ লিটার নিরাপদ (প্রয়োজনে ফুটিয়ে ঠান্ডা করা) পানিতে আধা চা-চামচ সাধারণ খাবার লবণ ও ৬ চা-চামচ (প্রায় ৪ টেবিল চামচ) চিনি ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। তবে এটি প্যাকেট ORS-এর মতো নিখুঁত ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্য দেয় না, তাই যত দ্রুত সম্ভব প্রকৃত ORS প্যাকেট সংগ্রহ করাই ভালো।
বানানোর সময় যা মেনে চলবেন:
- মাপার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাপের চামচ বা পাত্র ব্যবহার করুন, আন্দাজে নয়
- শুধু বিশুদ্ধ পানিতে মেশান — গরম পানি বা ফুটন্ত পানিতে মেশাবেন না এবং বানানো দ্রবণ পরে গরম করবেন না
- সাধারণ খাবার লবণ (টেবিল সল্ট) ব্যবহার করুন — সৈন্ধব লবণ, বিট লবণ বা স্বাদযুক্ত কোনো লবণ নয়
- মিষ্টি স্বাদ বাড়াতে বাড়তি চিনি, মধু, লেবু বা দুধ মেশাবেন না — এতে দ্রবণের কার্যকারিতা নষ্ট হতে পারে বা ডায়রিয়া আরও বাড়তে পারে
- একবার বানানো দ্রবণ ১২ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করুন (গরম আবহাওয়ায় আরও দ্রুত নষ্ট হতে পারে); ১২ ঘণ্টা পার হয়ে গেলে অবশিষ্ট অংশ ফেলে দিয়ে নতুন করে বানান
বয়স অনুযায়ী সঠিক মাত্রা
প্রতিবার পাতলা পায়খানা বা বমির পর নিচের মাত্রা অনুযায়ী খাবার স্যালাইন খাওয়ানো উচিত (এর পাশাপাশি স্বাভাবিক খাবার ও মায়ের বুকের দুধ চালিয়ে যেতে হবে, বন্ধ করা যাবে না):
- ২ বছরের কম বয়সী শিশু: প্রতিবার ৫০-১০০ মিলি (প্রায় ১০-২০ চা-চামচ)
- ২ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশু: প্রতিবার ১০০-২০০ মিলি (আধা থেকে ১ গ্লাস)
- ১০ বছরের বেশি বয়সী ও প্রাপ্তবয়স্ক: প্রতিবার ২০০-৪০০ মিলি (১-২ গ্লাস)
দৈনিক মোট প্রয়োজন নির্ভর করে শরীর থেকে কতটা তরল বেরিয়ে যাচ্ছে তার ওপর — তাই একবারে বেশি জোর করে না খাইয়ে বারবার অল্প অল্প করে খাওয়ানোই ভালো, বিশেষত বমি থাকলে।
শিশুর ডায়রিয়ায় জিংকের ভূমিকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি জিংক সাপ্লিমেন্টও দেওয়া উচিত — ৬ মাসের কম বয়সী শিশুকে দৈনিক ১০ মিলিগ্রাম এবং ৬ মাস বা তার বেশি বয়সী শিশুকে দৈনিক ২০ মিলিগ্রাম করে, টানা ১০-১৪ দিন। গবেষণায় দেখা গেছে জিংক ডায়রিয়ার স্থায়িত্ব ও তীব্রতা কমায় এবং পরবর্তী কয়েক মাসে নতুন করে ডায়রিয়া হওয়ার ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। ORS ও জিংক — এই দুটি মিলিয়েই WHO-এর মান অনুযায়ী শিশুর ডায়রিয়ার প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয়।
পানিশূন্যতার মাত্রা বোঝার উপায় — কখন বাড়িতে সামলানো যাবে, কখন নয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী পানিশূন্যতাকে সাধারণত তিন স্তরে ভাগ করা হয়:
- পানিশূন্যতা নেই (Plan A): রোগী স্বাভাবিক আচরণ করছে, স্বাভাবিকভাবে পান করছে। এক্ষেত্রে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর বাড়িতে ওপরের মাত্রা অনুযায়ী স্যালাইন খাওয়ালেই যথেষ্ট।
- কিছুটা পানিশূন্যতা (Plan B): অস্বাভাবিক তৃষ্ণা, কিছুটা অস্থিরতা বা খিটখিটে ভাব, চোখ কিছুটা বসে যাওয়া, ত্বক চিমটি দিলে ধীরে ফিরে আসা — এসব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের (সাধারণত ৪ ঘণ্টা) মধ্যে তত্ত্বাবধানে বেশি পরিমাণে স্যালাইন খাওয়াতে হয়।
- তীব্র পানিশূন্যতা (Plan C) — জরুরি: রোগী নিস্তেজ বা অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, চোখ খুব বেশি বসে গেছে, পানি পান করতে পারছে না বা করতে চাইছে না, ত্বক চিমটি দিলে খুব ধীরে ফিরছে — এই লক্ষণ দেখলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান, কারণ এক্ষেত্রে সাধারণত শিরায় (IV) স্যালাইন প্রয়োজন হয়, শুধু মুখে খাওয়ানো স্যালাইনে যথেষ্ট হয় না।
এছাড়া নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে খাবার স্যালাইন যথেষ্ট নয়, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া দরকার:
- ক্রমাগত বমির কারণে মুখে কিছুই ধরে রাখতে পারছে না
- পায়খানার সাথে রক্ত মিশে থাকা
- উচ্চ ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বর
- দুই দিনের বেশি সময় ধরে অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়া
- প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া
সাধারণ ভুল ও এর বিপদ
খাবার স্যালাইন নিয়ে সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক ভুলটি হলো প্রয়োজনের চেয়ে কম পানিতে বেশি গুঁড়ো মিশিয়ে ফেলা, অথবা একাধিক প্যাকেট একসাথে অল্প পানিতে মিশিয়ে "বেশি কার্যকর" করার চেষ্টা করা। এতে দ্রবণে লবণের ঘনত্ব প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়, যার ফলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে (হাইপারন্যাট্রেমিয়া বা লবণ বিষক্রিয়া)। এর লক্ষণ হতে পারে তীব্র তৃষ্ণা, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি, আর মারাত্মক ক্ষেত্রে খিঁচুনি পর্যন্ত হতে পারে — বিশেষ করে নবজাতক ও ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি। উল্টোদিকে বেশি পানিতে মিশিয়ে দ্রবণ পাতলা করে ফেললে তা যথাযথভাবে পানিশূন্যতা পূরণ করতে পারে না। তাই প্যাকেটের গায়ে লেখা পানির পরিমাণ (সাধারণত ৫০০ মিলি) অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
অন্যান্য সাধারণ ভুলের মধ্যে রয়েছে: গরম পানিতে মেশানো, বানানোর ১২ ঘণ্টা পার হয়ে যাওয়া দ্রবণ খাওয়ানো, অপরিষ্কার পাত্র বা পানি ব্যবহার করা, এবং বমির ভয়ে পুরোপুরি খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়া (এক্ষেত্রে বরং অল্প অল্প করে ঘন ঘন খাওয়ানো উচিত)।
বিশেষ পরিস্থিতি: নবজাতক, গর্ভবতী নারী, বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগী
নবজাতক ও শিশু: মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না, বরং স্যালাইনের পাশাপাশি বুকের দুধ চালিয়ে যেতে হবে। ছোট শিশুকে চামচে করে অল্প অল্প করে, ঘন ঘন খাওয়ানো ভালো।
গর্ভবতী নারী: গর্ভাবস্থায় বমি বা ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতায় খাবার স্যালাইন নিরাপদ ও উপকারী বলে বিবেচিত হয়, তবে বমি তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী হলে (যেমন হাইপারমেসিস) দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বয়স্ক ও কিডনি/হৃদরোগে আক্রান্ত রোগী: কিডনির কার্যক্ষমতা কমে থাকলে বা হৃদযন্ত্রের সমস্যা থাকলে শরীর অতিরিক্ত সোডিয়াম বা পটাশিয়াম ঠিকমতো প্রক্রিয়া করতে পারে না, তাই এসব রোগীর ক্ষেত্রে স্যালাইন খাওয়ানোর আগে ও চলাকালীন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সাধারণ ডায়রিয়া নাকি কলেরার মতো গুরুতর সংক্রমণ — পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন
বেশিরভাগ পাতলা পায়খানা ভাইরাসজনিত গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস থেকে হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে খাবার স্যালাইন ও পর্যাপ্ত বিশ্রামে সেরে যায়। তবে হঠাৎ শুরু হওয়া অতি পাতলা, "চালের ফ্যানের মতো" সাদাটে পায়খানা, ঘন ঘন বমি এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দিলে তা কলেরার লক্ষণ হতে পারে — এক্ষেত্রে সাধারণ ORS চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ও প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ও শিরায় স্যালাইনের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়ে। পায়খানায় রক্ত বা মিউকাস দেখা দিলে সেটি ব্যাকটেরিয়াজনিত (যেমন শিগেলা) সংক্রমণের ইঙ্গিত দিতে পারে, যেখানে শুধু স্যালাইনে কাজ নাও হতে পারে। তাই উপসর্গ তীব্র বা অস্বাভাবিক মনে হলে স্ব-চিকিৎসায় সময় নষ্ট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
প্যাকেট সংরক্ষণ ও মেয়াদ সম্পর্কে জানা জরুরি
না খোলা খাবার স্যালাইনের প্যাকেট ৩০°C-এর নিচে, আলো ও আর্দ্রতা থেকে দূরে, শুকনো জায়গায় রাখা উচিত এবং প্যাকেটের গায়ে লেখা মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ কেনার সময় ও ব্যবহারের আগে অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত। মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজা/স্যাঁতসেঁতে হয়ে যাওয়া প্যাকেট ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এতে উপাদানগুলোর কার্যকারিতা ঠিক নাও থাকতে পারে।
খাবার স্যালাইন বনাম বাজারের "এনার্জি" বা "ইলেকট্রোলাইট" পানীয়
বাজারে পাওয়া অনেক স্পোর্টস ড্রিংক বা এনার্জি ড্রিংককে অনেকে ORS-এর বিকল্প মনে করেন, কিন্তু এগুলোর সোডিয়াম-গ্লুকোজ অনুপাত চিকিৎসাসম্মত ORS ফর্মুলার মতো নিখুঁতভাবে তৈরি নয় — সাধারণত এতে চিনির পরিমাণ বেশি ও প্রয়োজনীয় লবণের পরিমাণ কম থাকে। সাধারণ কায়িক পরিশ্রম বা হালকা ঘামের ক্ষেত্রে এসব পানীয় চলতে পারে, কিন্তু প্রকৃত ডায়রিয়া বা চিকিৎসাগত পানিশূন্যতায় এগুলো খাবার স্যালাইনের বিকল্প নয়।
পানিশূন্যতা প্রতিরোধে করণীয়
- নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানি পান করুন, প্রয়োজনে ফুটিয়ে বা বিশুদ্ধ করে
- খাবার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন
- শিশুদের সময়মতো টিকা (যেমন রোটাভাইরাস-সংক্রান্ত টিকা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) সম্পন্ন করুন
- ঘরে সবসময় অন্তত কয়েক প্যাকেট খাবার স্যালাইন মজুত রাখুন, বিশেষ করে গরমকাল ও বর্ষার ডায়রিয়া-প্রবণ সময়ে
খাবার স্যালাইন একটি সহজলভ্য, সস্তা কিন্তু জীবন বাঁচানো ওষুধ — তবে এর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সঠিক নিয়মে বানানো ও খাওয়ানোর ওপর। ডায়রিয়া বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে সঠিক মাত্রায় স্যালাইন শুরু করুন, তবে অবস্থার অবনতি হলে বা বিপদচিহ্ন দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ চিকিৎসক বা হাসপাতালের সহায়তা নিন। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্তের জন্য সবসময় একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ এবং আন্তর্জাতিক ডায়রিয়া রোগ গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (icddr,b)-এর নির্দেশিকা ও গবেষণা তথ্য অনুসরণে লেখা।
Frequently Asked Questions
খাবার স্যালাইন কি শুধু ডায়রিয়ার জন্যই ব্যবহার করা যায়?
এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন কতটুকু পানিতে মেশাতে হয়?
বানানো স্যালাইন কতক্ষণ পর্যন্ত খাওয়া নিরাপদ?
শিশুর ডায়রিয়ায় শুধু ORS দিলেই কি যথেষ্ট?
বেশি করে স্যালাইন খাওয়ালে কি দ্রুত সেরে উঠবে?
কোন লক্ষণ দেখলে বুঝব হাসপাতালে নেওয়া জরুরি?
গর্ভবতী নারী বা কিডনি রোগীরা কি নিশ্চিন্তে খাবার স্যালাইন খেতে পারবেন?
স্পোর্টস ড্রিংক বা এনার্জি ড্রিংক কি ORS-এর বিকল্প হতে পারে?
Comments
No comments yet. Be the first to comment.
Leave a comment
Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.


