osudhkosh
New

ম্যালেরিয়া: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

Published: October 13, 2026

Share:
ম্যালেরিয়া: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে ম্যালেরিয়াকে অনেকেই "পুরনো রোগ" মনে করে ভুলে যান, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি এখনও একটি সক্রিয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা দেখায় রোগ নির্মূলের লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে। দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশই তিনটি পার্বত্য জেলা— বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে কেন্দ্রীভূত, এবং ২০২৫ সালের হিসাবে এককভাবে বান্দরবানেই ৪৯% ও রাঙামাটিতে ৩৫% রোগী পাওয়া গেছে। সরকারের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কৌশল পরিকল্পনা (২০২৪-২০৩০) অনুযায়ী লক্ষ্য রাখা হয়েছে ২০২৭ সালের মধ্যে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত ম্যালেরিয়ায় শূন্য মৃত্যু এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্মূল। এই নিবন্ধে ম্যালেরিয়ার কারণ, লক্ষণ, বিপদ চিহ্ন, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার সাম্প্রতিক চিত্র

সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ১৬,৫৬৭ জন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৬ জনের মৃত্যু হয়, যা ২০২২ সালের তুলনায় (১৮,১৯৫ আক্রান্ত, ১৪ জনের মৃত্যু) কিছুটা উন্নতি দেখায়। তবে ২০২৫ সালে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১০ হাজারে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে, যা দেখায় রোগটি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বান্দরবান জেলার লামা, আলীকদম ও থানচি উপজেলা এবং রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত— এককভাবে জুরাছড়িতেই রাঙামাটি জেলার মোট রোগীর প্রায় ৫১ শতাংশ দেখা যায়। এই এলাকাগুলোয় পাহাড়ি জঙ্গল, ঘন বনাঞ্চল ও বর্ষা-পরবর্তী আবহাওয়া মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে, যে কারণে এখানে বসবাসকারী বা ভ্রমণকারী ব্যক্তিদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকা জরুরি।

ম্যালেরিয়া কী এবং কেন হয়?

ম্যালেরিয়া একটি পরজীবীবাহিত রোগ, যা প্লাজমোডিয়াম (Plasmodium) নামক এককোষী পরজীবীর সংক্রমণে হয়। সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস (Anopheles) মশার কামড়ের মাধ্যমে এই পরজীবী মানুষের রক্তে প্রবেশ করে এবং লিভার ও লোহিত রক্তকণিকায় বংশবিস্তার করে। বাংলাদেশে মূলত দুটি প্রজাতি বেশি দেখা যায়— প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম (সবচেয়ে বিপজ্জনক ও জটিলতা তৈরি করতে সক্ষম) এবং প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স (যা পরবর্তীতে রিল্যাপ্স বা পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রবণতা রাখে)। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অ্যানোফিলিস মশা সাধারণত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কামড়ায়— এটি ডেঙ্গু ছড়ানো এডিস মশার থেকে ভিন্ন, যা দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। ম্যালেরিয়া সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না; এটি শুধু মশার কামড়ে ছড়ায়, যদিও বিরল ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালন বা গর্ভবতী মায়ের কাছ থেকে গর্ভের শিশুতে সংক্রমণ হতে পারে।

লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন ম্যালেরিয়া হয়েছে?

মশার কামড়ের পর সাধারণত ৭ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামে এই সময় সবচেয়ে কম (প্রায় ৭-১৪ দিন), আর কিছু ভাইভ্যাক্স স্ট্রেইনে উপসর্গ দেখা দিতে কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো:

  • কাঁপুনি দিয়ে জ্বর, যা ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে
  • মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা
  • বমি বমি ভাব, বমি বা ডায়রিয়া
  • প্রচণ্ড ক্লান্তি ও দুর্বলতা

ক্লাসিক ম্যালেরিয়ার জ্বর তিনটি ধাপে আসে— প্রথমে ঠান্ডা লাগা ও কাঁপুনি (কোল্ড স্টেজ), তারপর তীব্র জ্বর (হট স্টেজ), এবং সবশেষে প্রচুর ঘাম দিয়ে জ্বর কমে যাওয়া (সোয়েটিং স্টেজ)। পুরো আক্রমণ ৬-১০ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে একদিন পর পর (বা নির্দিষ্ট বিরতিতে) জ্বর ফিরে আসে। তবে বাস্তবে এই নিয়মিত প্যাটার্ন সবসময় স্পষ্টভাবে দেখা যায় না, তাই শুধু জ্বরের ধরন দেখে ম্যালেরিয়া বাতিল করা ঠিক নয়— রক্ত পরীক্ষা করাই নিরাপদ।

বিপদ চিহ্ন: জটিল বা সিভিয়ার ম্যালেরিয়া

চিকিৎসা না পেলে বা দেরি হলে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম সংক্রমণ জটিল ম্যালেরিয়ায় রূপ নিতে পারে, যার মৃত্যুর হার চিকিৎসা ছাড়া ১০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে। নিচের উপসর্গ দেখা দিলে তা জরুরি বিপদ চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত:

  • তীব্র মাথাব্যথার সাথে বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ার লক্ষণ)
  • তীব্র রক্তশূন্যতা ও শ্বাসকষ্ট
  • চোখ বা শরীরে জন্ডিসের মতো হলুদ ভাব (লিভার আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ)
  • প্রস্রাব কমে যাওয়া বা গাঢ় রঙের প্রস্রাব (কিডনির সমস্যার লক্ষণ)
  • অতিরিক্ত দুর্বলতা, বসে থাকতে না পারা বা জ্ঞান হারানো

এই লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি, কারণ জটিল ম্যালেরিয়া কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাণঘাতী হতে পারে।

রিল্যাপ্স বা পুনরায় ম্যালেরিয়া হওয়া

প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স বা ওভালি প্রজাতির পরজীবী লিভারে সুপ্ত অবস্থায় (হাইপনোজয়েট নামে পরিচিত) থেকে যেতে পারে এবং সম্পূর্ণ লক্ষণমুক্ত থাকার মাস বা এমনকি কয়েক বছর পরও পুনরায় সক্রিয় হয়ে রিল্যাপ্স ঘটাতে পারে। অন্যদিকে ফ্যালসিপেরাম বা ম্যালারিয়া প্রজাতিতে এই সুপ্ত স্তর থাকে না, কিন্তু চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থাকলে পরজীবী আবার বেড়ে গিয়ে রোগ ফিরে আসতে পারে (রিকার্ডেসেন্স)। এই কারণেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূর্ণ কোর্স ওষুধ খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রোগ নির্ণয়: কোন পরীক্ষা করাবেন?

জ্বরের সাথে সন্দেহ হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। দুটি প্রধান পরীক্ষা পদ্ধতি রয়েছে:

  • র‍্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (RDT): ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে ফল পাওয়া যায় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়ক, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলক ভালো কাজ করে।
  • মাইক্রোস্কোপি (ব্লাড ফিল্ম/স্লাইড টেস্ট): পরজীবীর প্রজাতি নির্ণয় এবং রক্তে পরজীবীর মাত্রা (parasite density) বোঝার জন্য এখনও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত।

গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে RDT-এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গবেষণায় মিশ্র ফল পাওয়া গেছে— কিছু গবেষণায় RDT মাইক্রোস্কোপির চেয়ে বেশি সংক্রমণ ধরতে পেরেছে, আবার কিছু গবেষণায় কম সংবেদনশীলতা দেখা গেছে। এই কারণে গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রায়ই দুটি পরীক্ষার সমন্বয় করে নিশ্চিত হন। তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের সার্বিক মূল্যায়ন অনুসরণ করা উচিত।

চিকিৎসা: কীভাবে ম্যালেরিয়া সারানো হয়?

সাধারণ (জটিলতাহীন) ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক কম্বিনেশন থেরাপি (ACT) মুখে খাওয়ার ওষুধ হিসেবে সুপারিশ করে। জটিল বা সিভিয়ার ম্যালেরিয়ার ক্ষেত্রে হাসপাতালে শিরায় বা মাংসপেশিতে আর্টেসুনেট ইনজেকশন দেওয়া হয়— কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা ধরে (ভর্তির সময়, ১২ ঘণ্টা ও ২৪ ঘণ্টায়, তারপর প্রতিদিন একবার), যতক্ষণ না রোগী মুখে ওষুধ খেতে সক্ষম হন। এরপর ৩ দিনের সম্পূর্ণ ACT কোর্স দিয়ে চিকিৎসা শেষ করা হয়। আর্টেসুনেট না থাকলে আর্টেমিথার বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স সংক্রমণে রিল্যাপ্স প্রতিরোধের জন্য প্রাইমাকুইনের মতো অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োজন হয়, যা লিভারের সুপ্ত পরজীবী সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করে— তবে G6PD এনজাইমের ঘাটতি থাকলে এই ওষুধে রক্তকোষ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাই চিকিৎসক প্রয়োজনে আগে এই পরীক্ষা করিয়ে নেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চিকিৎসক নির্ধারিত সম্পূর্ণ কোর্স ওষুধ শেষ করা— মাঝপথে বন্ধ করলে পরজীবী সম্পূর্ণ নির্মূল না হয়ে রোগ ফিরে আসার বা ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠার ঝুঁকি বাড়ে।

শিশু, গর্ভবতী মা ও বয়স্কদের জন্য বিশেষ সতর্কতা

শিশুদের ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া দ্রুত জটিল রূপ নিতে পারে, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও সম্পূর্ণ বিকশিত হয় না। জ্বরের সাথে অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব, খেতে না চাওয়া বা খিঁচুনি দেখা দিলে অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো জরুরি।

গর্ভাবস্থায় ম্যালেরিয়া হলে তীব্র রক্তশূন্যতা, কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়া, এমনকি গর্ভপাত বা মৃতপ্রসবের ঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন— ডক্সিসাইক্লিন ও মেফ্লোকুইনের মতো কিছু প্রতিরোধক ওষুধ গর্ভাবস্থায় (বিশেষত প্রথম তিন মাসে) নিরাপদ নয় বলে বিবেচিত হয়, তাই গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে সবসময় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী জটিল ম্যালেরিয়ায় শিরায় আর্টেসুনেট গর্ভাবস্থার সব ত্রৈমাসিকেই প্রযোজ্য বলে স্বীকৃত।

বয়স্ক ও অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে (যেমন ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ) আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া জটিল আকার নেওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার সাথে পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন?

জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথার কারণে ম্যালেরিয়াকে অনেক সময় ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। তবে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করার মতো: ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশা দিয়ে, যা মূলত দিনের বেলায় কামড়ায়, আর ম্যালেরিয়া ছড়ায় অ্যানোফিলিস মশা দিয়ে, যা সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। ম্যালেরিয়ায় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর ওঠা এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে জ্বর ফিরে আসার প্যাটার্ন বেশি দেখা যায়, যেখানে ডেঙ্গুতে সাধারণত শরীরে র‍্যাশ, চোখের পেছনে ব্যথা ও প্লেটলেট কমে যাওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে। নির্দিষ্ট রোগ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা অপরিহার্য— ম্যালেরিয়ার জন্য RDT বা মাইক্রোস্কোপি, ডেঙ্গুর জন্য NS1 অ্যান্টিজেন বা প্লেটলেট কাউন্ট পরীক্ষা করা হয়।

কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন?

পার্বত্য এলাকায় বসবাস বা সেখানে ভ্রমণের পর জ্বর হলে দেরি না করে রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। উপরে উল্লেখিত বিপদ চিহ্নগুলোর (খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব কমে যাওয়া, জন্ডিস) কোনোটি দেখা দিলে অপেক্ষা না করে সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়া উচিত।

প্রতিরোধ: ম্যালেরিয়া থেকে বাঁচার উপায়

  • সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত মশারি ব্যবহার করা (বিশেষ করে কীটনাশক-শোধিত মশারি)
  • সন্ধ্যার পর শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা এবং মশা তাড়ানোর রিপেলেন্ট ব্যবহার করা
  • ঘরের জানালা-দরজায় মশার জাল স্থাপন করা
  • ঘরের আশেপাশে জমে থাকা পানি সরিয়ে মশার বংশবিস্তার রোধ করা
  • পার্বত্য জেলাগুলোতে (বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি) ভ্রমণের আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সতর্কতা ও পরামর্শ অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রতিরোধক ওষুধ সম্পর্কে পরামর্শ নেওয়া

বর্তমানে শিশুদের জন্য তৈরি কিছু ম্যালেরিয়া টিকা (যেমন RTS,S ও R21) বিশ্বের কিছু এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে, তবে বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এখনও কোনো ম্যালেরিয়া টিকা অন্তর্ভুক্ত নয়— ফলে মশার কামড় থেকে সুরক্ষাই এখনও সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ উপায়।

উপসংহার

ম্যালেরিয়া বাংলাদেশে সারাদেশের সমস্যা না হলেও পার্বত্য তিন জেলায় এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য ঝুঁকি, এবং জটিল হয়ে উঠলে এটি দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে। জ্বর হলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করানো, সম্পূর্ণ চিকিৎসা কোর্স শেষ করা এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নেওয়াই এই রোগ থেকে বাঁচার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায়। যেকোনো সন্দেহ বা উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ম্যালেরিয়া নির্দেশিকা অনুসরণে লেখা।

Frequently Asked Questions

ম্যালেরিয়া কি একজনের কাছ থেকে অন্যজনে ছড়ায়?
না, ম্যালেরিয়া সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। এটি কেবল সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশার কামড়ে ছড়ায়। তবে বিরল ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালন বা গর্ভবতী মায়ের কাছ থেকে গর্ভের শিশুতেও সংক্রমণ হতে পারে।
ম্যালেরিয়া হলে জ্বর কেমন হয়?
সাধারণত কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে, যা ১০৫-১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে। জ্বর তিনটি ধাপে আসে— প্রথমে কাঁপুনি (কোল্ড স্টেজ), তারপর তীব্র জ্বর (হট স্টেজ), এবং শেষে প্রচুর ঘাম (সোয়েটিং স্টেজ)। পুরো আক্রমণ ৬-১০ ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে, তবে বাস্তবে এই ক্লাসিক প্যাটার্ন সবসময় স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।
ম্যালেরিয়ার উপসর্গ দেখা দিতে কতদিন সময় লাগে?
সাধারণত মশার কামড়ের ৭ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়। প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামে সবচেয়ে কম সময়ে (প্রায় ৭-১৪ দিন), আর কিছু ভাইভ্যাক্স স্ট্রেইনে এই সময় কয়েক মাস পর্যন্তও হতে পারে।
ম্যালেরিয়া সারিয়ে ফেলার পরও কি আবার হতে পারে?
হ্যাঁ, প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স বা ওভালি প্রজাতির ক্ষেত্রে পরজীবী লিভারে সুপ্ত অবস্থায় (হাইপনোজয়েট) থেকে যেতে পারে এবং মাস বা বছর পরে পুনরায় সক্রিয় হয়ে রিল্যাপ্স ঘটাতে পারে। এই রিল্যাপ্স ঠেকাতে প্রাইমাকুইনের মতো অতিরিক্ত ওষুধ প্রয়োজন হয়।
RDT আর মাইক্রোস্কোপি পরীক্ষার মধ্যে পার্থক্য কী?
RDT (র‍্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট) ১৫-২০ মিনিটে ফল দেয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত নির্ণয়ে কার্যকর, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। মাইক্রোস্কোপি (ব্লাড ফিল্ম) পরজীবীর প্রজাতি নির্ণয় ও মাত্রা বোঝার জন্য এখনও সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। চিকিৎসক প্রায়ই দুটোর সমন্বয়ে নির্ণয় নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি কোথায়?
দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশই তিনটি পার্বত্য জেলা— বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী বান্দরবানে ৪৯% এবং রাঙামাটিতে ৩৫% রোগী পাওয়া গেছে, এবং বান্দরবানের লামা, আলীকদম, থানচি ও রাঙামাটির জুরাছড়ি উপজেলা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
গর্ভবতী মায়েদের ম্যালেরিয়া হলে কী ঝুঁকি থাকে?
গর্ভাবস্থায় ম্যালেরিয়া হলে তীব্র রক্তশূন্যতা, কম ওজনের শিশু জন্ম, এমনকি গর্ভপাত বা মৃতপ্রসবের ঝুঁকি বাড়ে। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সতর্কতা জরুরি— ডক্সিসাইক্লিন ও মেফ্লোকুইনের মতো কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় নিষিদ্ধ, তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়া আবশ্যক।
ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের জন্য কী করা উচিত?
সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত (যখন অ্যানোফিলিস মশা কামড়ায়) মশারি ব্যবহার, শরীর ঢেকে রাখে এমন পোশাক পরা, মশা তাড়ানোর রিপেলেন্ট লাগানো এবং জানালা-দরজায় মশার জাল ব্যবহার করা জরুরি। পার্বত্য জেলাগুলোতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরামর্শ অনুসরণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে রুটিন কর্মসূচিতে এখনো কোনো ম্যালেরিয়া টিকা অন্তর্ভুক্ত নয়।
Share:

Comments

No comments yet. Be the first to comment.

Leave a comment

Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.

Never published

Published after review.

More news