নবজাতক শিশুর জ্বর হলে কী করবেন? কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
Published: September 21, 2026

নবজাতক শিশুর শরীর একটু গরম লাগলেই অনেক বাবা-মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। আবার অনেকে মনে করেন, ঘরে থাকা ওষুধ বা ঠান্ডা পানি দিয়ে শরীর মুছে দিলেই জ্বর কমে যাবে। কিন্তু নবজাতকের ক্ষেত্রে জ্বরকে অবহেলা করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। এত ছোট শিশুর ক্ষেত্রে জ্বর কখনো কখনো গুরুতর সংক্রমণের একমাত্র লক্ষণও হতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ: এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য। নবজাতকের জ্বর হলে ঘরে বসে রোগ নির্ণয় বা নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
নবজাতকের জ্বর বলতে কত তাপমাত্রা বোঝায়?
শিশুর শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা ওঠানামা করতে পারে। তবে সাধারণভাবে ৩৮°C (১০০.৪°F) বা তার বেশি তাপমাত্রাকে জ্বর হিসেবে ধরা হয়। নবজাতক ও খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে তাপমাত্রা মাপার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর বয়স | তাপমাত্রা | কী করবেন |
|---|---|---|
০–২৮ দিন | ৩৮°C বা বেশি | অবিলম্বে চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন |
২৯–৬০ দিন | ৩৮°C বা বেশি | দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ/মূল্যায়ন প্রয়োজন |
৩ মাসের কম | ৩৮°C বা বেশি | অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন |
যেকোনো বয়স | খুব কম তাপমাত্রা বা শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা | শিশুর অবস্থা খারাপ হলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন |
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সের গাইডলাইনে ৮–৬০ দিন বয়সী শিশুর ৩৮°C বা তার বেশি জ্বরকে গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে।
শুধু শরীর ছুঁয়ে কি জ্বর বোঝা যায়?
সবসময় নয়। শিশুর কপাল বা শরীর গরম মনে হলেও প্রকৃত তাপমাত্রা জানা যায় না। আবার গুরুতর অসুস্থ শিশুর সবসময় জ্বর নাও থাকতে পারে।
তাই শিশুকে অস্বাভাবিক গরম মনে হলে ডিজিটাল থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা মাপা ভালো।
নবজাতকের জ্বরের সম্ভাব্য কারণ কী?
জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়; এটি শরীরে কোনো সমস্যা বা সংক্রমণের একটি লক্ষণ হতে পারে। নবজাতকের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের কারণে জ্বর হতে পারে।
সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
মূত্রনালির সংক্রমণ
শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
রক্তে সংক্রমণ
কিছু ক্ষেত্রে মেনিনজাইটিস বা মস্তিষ্কের আবরণে সংক্রমণ
অন্যান্য ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ
খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে শুধু জ্বর দেখে কারণ নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে কারণ নির্ণয় করেন।
নবজাতকের জ্বর হলে প্রথমে কী করবেন?
১. তাপমাত্রা মাপুন
শিশু গরম মনে হলে ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করে তাপমাত্রা মাপুন এবং কত ডিগ্রি ও কখন মাপা হয়েছে তা লিখে রাখুন।
২. শিশুর বয়স বিবেচনা করুন
শিশুর বয়স ৩ মাসের কম হলে ৩৮°C বা তার বেশি তাপমাত্রাকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু জ্বর কমে কিনা দেখে অপেক্ষা করা ঠিক নয়।
৩. বুকের দুধ চালিয়ে যান
শিশু বুকের দুধ খেতে পারলে স্বাভাবিকভাবে বুকের দুধ দেওয়ার চেষ্টা করুন। এতে শিশুর তরল গ্রহণ বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে শিশু যদি দুধ খেতে না পারে বা বারবার বমি করে, দ্রুত চিকিৎসা নিন।
৪. শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় পরাবেন না
জ্বরের সময় শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় বা ভারী কম্বলে ঢেকে রাখবেন না। অতিরিক্ত গরম করে রাখলে শরীরের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে।
৫. নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ দেবেন না
বিশেষ করে নবজাতককে নিজের সিদ্ধান্তে প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন বা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত নয়।
২ মাসের কম বয়সী শিশুকে প্যারাসিটামল দেওয়ার বিষয়েও চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন এবং ৩ মাসের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে আইবুপ্রোফেন ব্যবহার করা উচিত নয়, যদি না চিকিৎসক বিশেষভাবে নির্দেশ দেন।
কোন লক্ষণগুলো দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে?
জ্বরের সঙ্গে নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন—
শিশু দুধ খেতে না চাইলে
স্বাভাবিকের তুলনায় খুব বেশি ঘুমিয়ে থাকলে বা জাগানো কঠিন হলে
শিশুর কান্না দুর্বল, অস্বাভাবিক বা থামানো কঠিন হলে
শ্বাস নিতে কষ্ট হলে
শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হলে
ঠোঁট বা শরীর নীলচে/ধূসর/অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে দেখালে
খিঁচুনি হলে
বারবার বমি হলে
প্রস্রাবের পরিমাণ অনেক কমে গেলে
শরীরে এমন র্যাশ হলে যা চাপ দিলে ফ্যাকাশে হয় না
শিশুকে অস্বাভাবিক নিস্তেজ বা অসুস্থ মনে হলে
শরীরের তাপমাত্রা খুব কমে গেলেও
এ ধরনের লক্ষণ গুরুতর অসুস্থতার সংকেত হতে পারে।
জ্বর হলে কি শিশুকে ঠান্ডা পানিতে গোসল করানো যাবে?
জ্বর কমানোর জন্য ঠান্ডা পানি, বরফ বা অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি ব্যবহার করে শিশুকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করবেন না।
নবজাতকের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো জ্বরের কারণ খুঁজে বের করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নেওয়া। শুধু শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করে চিকিৎসা দেরি করা উচিত নয়।
টিকা দেওয়ার পর জ্বর হলে কী করবেন?
কিছু শিশুর টিকা নেওয়ার পর সাময়িকভাবে শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে পারে। তবে নবজাতক বা খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে ৩৮°C বা তার বেশি তাপমাত্রা হলে শুধুমাত্র টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
শিশুর বয়স, টিকার সময় এবং অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নবজাতকের জ্বর নিয়ে যেসব ভুল করবেন না
যা করবেন না | কেন |
|---|---|
নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না | সব জ্বর ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় না |
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া জ্বরের ওষুধ দেবেন না | নবজাতকের ওষুধের ডোজ বয়স ও ওজন অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয় |
ঠান্ডা পানি/বরফ ব্যবহার করবেন না | শিশুর অস্বস্তি ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে |
অতিরিক্ত কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখবেন না | শরীরের তাপ আরও বাড়তে পারে |
শুধু কপাল ছুঁয়ে জ্বর নির্ণয় করবেন না | প্রকৃত তাপমাত্রা জানা যায় না |
৩৮°C জ্বরকে অপেক্ষা করে দেখবেন না | ৩ মাসের কম বয়সে দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন |
কখন পরীক্ষা লাগতে পারে?
নবজাতকের জ্বরের ক্ষেত্রে চিকিৎসক শিশুর বয়স, শারীরিক অবস্থা, জন্মের ইতিহাস এবং অন্যান্য লক্ষণ দেখে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, রক্তের কালচার বা অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। খুব অল্প বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে গুরুতর ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ঝুঁকি মূল্যায়নে চিকিৎসকেরা বয়সভেদে আলাদা পদ্ধতি অনুসরণ করেন।
নবজাতকের জ্বর: সহজে মনে রাখার নিয়ম
৩ মাসের কম বয়স + ৩৮°C বা বেশি = চিকিৎসকের দ্রুত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আর যদি শিশুর শ্বাসকষ্ট, দুধ না খাওয়া, অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, খিঁচুনি, নীলচে ত্বক বা অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ থাকে, তাহলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন।
তথ্যসূত্র
American Academy of Pediatrics (AAP) — Evaluation and Management of Well-Appearing Febrile Infants 8 to 60 Days Old
American Academy of Pediatrics — Fever in Infants Younger Than 60 Days
NHS — How to Take Your Baby’s Temperature
NHS — High Temperature (Fever) in Children
NHS — Is Your Baby or Toddler Seriously Ill?
Osudhkosh স্বাস্থ্য-তথ্য: নবজাতকের জ্বরের ক্ষেত্রে অনলাইনের তথ্যের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা শুরু না করে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
Frequently Asked Questions
নবজাতকের কত তাপমাত্রাকে জ্বর বলা হয়?
১ মাসের শিশুর ৩৮°C জ্বর হলে কী করব?
শিশুর শরীর গরম কিন্তু থার্মোমিটারে জ্বর নেই—কী করব?
নবজাতকের জ্বরে প্যারাসিটামল দেওয়া যাবে?
নবজাতককে জ্বরের সময় বুকের দুধ দেওয়া যাবে?
জ্বর কমে গেলে কি ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন নেই?
নবজাতকের জ্বর কি সবসময় সংক্রমণের কারণে হয়?
নবজাতকের জ্বরের সঙ্গে দুধ না খাওয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জ্বরের সময় শিশুকে বেশি কম্বল দেওয়া যাবে?
শিশুর তাপমাত্রা কীভাবে মাপব?
Comments
No comments yet. Be the first to comment.
Leave a comment
Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.


