osudhkosh
New

টাইফয়েড জ্বর: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও TCV টিকার সম্পূর্ণ গাইড

Published: September 27, 2026

Share:
টাইফয়েড জ্বর: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও TCV টিকার সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে টাইফয়েড জ্বর দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। ২০২১ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার মানুষ টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে প্রায় ৮,০০০ জনের মৃত্যু হয়—আর এই মৃত্যুর প্রায় ৬৮% ছিল শিশু। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও সরকার ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (TCV) ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে, যেখানে ৯ মাস থেকে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ৫ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ক্যাম্পেইন শেষে ৪ কোটি ২৪ লাখেরও বেশি শিশু টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৭%। ২০২৬ সাল থেকে এই টিকা নিয়মিত EPI টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। তবু টাইফয়েড এখনো বাংলাদেশে সাধারণ একটি রোগ, তাই এর লক্ষণ, ঝুঁকি ও করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) টাইফয়েডকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং উচ্চ-প্রকোপ দেশগুলোতে টিকা কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করেছে—বিশেষত যেখানে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী স্ট্রেইনের প্রকোপ বেশি।

টাইফয়েড জ্বর কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

টাইফয়েড জ্বর হলো সালমোনেলা টাইফি (Salmonella Typhi) নামক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি সংক্রামক রোগ। এই জীবাণু মূলত দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে (fecal-oral route)—অর্থাৎ আক্রান্ত ব্যক্তির মলে থাকা জীবাণু যখন কোনোভাবে পানি বা খাবার দূষিত করে এবং তা অন্য কেউ খায়, তখন সংক্রমণ ছড়ায়। অপরিশোধিত পানি, রাস্তার ধারের কাটা ফল বা শরবত, ঠিকমতো ধোয়া হয়নি এমন সবজি এবং অপরিচ্ছন্ন হাতে তৈরি খাবার—এসবই বাংলাদেশে সংক্রমণের প্রধান উৎস। যেসব এলাকায় নিরাপদ সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা দুর্বল, সেখানে টাইফয়েডের ঝুঁকি বেশি।

জীবাণু শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত ৬ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৮-১৪ দিনের মধ্যে) লক্ষণ প্রকাশ পায়—একে বলা হয় ইনকিউবেশন পিরিয়ড। যত বেশি পরিমাণ জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে, লক্ষণ তত দ্রুত দেখা দিতে পারে। যারা অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বাস করেন, নিরাপদ পানির সুযোগ পান না, রাস্তার খাবারের ওপর বেশি নির্ভরশীল, খাদ্য প্রস্তুত/পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত, অথবা আগে থেকেই টাইফয়েড-প্রবণ এলাকায় ভ্রমণ করেছেন—তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

সপ্তাহ ধরে লক্ষণের ধরন: কীভাবে বুঝবেন?

টাইফয়েডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর লক্ষণ হঠাৎ না এসে ধাপে ধাপে বাড়ে—চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় "স্টেপ-ল্যাডার" জ্বর (প্রতিদিন আগের দিনের চেয়ে একটু বেশি জ্বর ওঠে)।

  • প্রথম সপ্তাহ: ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, সর্বাঙ্গে ব্যথা, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে জ্বরের তুলনায় হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে কম থাকা (relative bradycardia)। এই সময় কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া—দুটোই হতে পারে।
  • দ্বিতীয় সপ্তাহ: জ্বর ক্রমাগত উচ্চ মাত্রায় থাকে, পেটে ব্যথা বাড়ে, লিভার-প্লীহা ফুলে যেতে পারে (hepatosplenomegaly), এবং কারো কারো বুক-পেটের ত্বকে হালকা গোলাপি ফুসকুড়ি (rose spots) দেখা দিতে পারে।
  • তৃতীয় সপ্তাহ (চিকিৎসা না করালে): এই পর্যায়ে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে—অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া (intestinal perforation), অন্ত্রে রক্তক্ষরণ, এমনকি মস্তিষ্কে প্রভাব (এনসেফালোপ্যাথি)। গবেষণা বলছে, অন্ত্র ছিদ্র সাধারণত আক্রান্তদের ১-২% ক্ষেত্রে ঘটে এবং প্রায় সবসময় তৃতীয় সপ্তাহের আগে ঘটে না, ছোট অন্ত্রের শেষ অংশে (ileum)।

বিপদ চিহ্ন: কখন এটি জরুরি অবস্থা

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া প্রয়োজন:

  • হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা সঙ্গে পেট শক্ত/টানটান হয়ে যাওয়া (অন্ত্র ছিদ্রের লক্ষণ হতে পারে)
  • মলের সঙ্গে রক্ত যাওয়া বা কালচে মল
  • তিন দিনের বেশি জ্বর কমছে না, বা ওষুধ খাওয়ার পরও জ্বর ক্রমাগত বাড়ছে
  • প্রচণ্ড দুর্বলতা, বিভ্রান্তি বা অচেতনতার লক্ষণ
  • শিশুদের ক্ষেত্রে প্রস্রাব কমে যাওয়া, ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়ার মতো পানিশূন্যতার লক্ষণ

টাইফয়েড, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া—পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন?

বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে জ্বরের প্রধান কারণ হতে পারে টাইফয়েড, ডেঙ্গু অথবা ম্যালেরিয়া—তিনটির লক্ষণে মিল থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে:

  • টাইফয়েড: জ্বর ধীরে ধীরে বাড়ে (স্টেপ-ল্যাডার প্যাটার্ন), সঙ্গে থাকে পেটে অস্বস্তি, কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া এবং জ্বরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম হৃদস্পন্দন।
  • ডেঙ্গু: হঠাৎ তীব্র জ্বর ওঠে, সঙ্গে তীব্র গাঁটে-মাংসপেশিতে ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং শরীরে র‍্যাশ; প্লাটিলেট দ্রুত কমতে পারে।
  • ম্যালেরিয়া: নির্দিষ্ট বিরতিতে (৪৮-৭২ ঘণ্টা পরপর, প্রজাতিভেদে) কাঁপুনি-শীত, এরপর তীব্র জ্বর এবং শেষে ঘাম দিয়ে জ্বর কমে যাওয়ার চক্র (cold-hot-sweating stage) দেখা যায়, পেটের সমস্যা তুলনামূলক কম থাকে।

যেহেতু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে আলাদা করা কঠিন, তাই সন্দেহ হলে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়াই নিরাপদ।

নির্ণয়ের পরীক্ষা: Widal টেস্ট নাকি ব্লাড কালচার?

বাংলাদেশে অনেক জায়গায় এখনো Widal টেস্ট ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় কারণ এটি সহজলভ্য ও কম খরচে করা যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখন এটি একা নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয় না—কারণ অন্যান্য জীবাণুর সঙ্গে ক্রস-রিঅ্যাকশনের কারণে ভুল পজিটিভ বা ভুল নেগেটিভ ফল আসতে পারে এবং একে ব্যাখ্যা করা কঠিন। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য (gold standard) পরীক্ষা হলো ব্লাড কালচার, বিশেষত অসুস্থতার প্রথম সপ্তাহে করালে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে স্টুল বা ইউরিন কালচারও সহায়ক হতে পারে। সাধারণ রক্ত পরীক্ষা (CBC) বা CRP-এর মতো প্রদাহ-নির্দেশক পরীক্ষাগুলো টাইফয়েডের জন্য নির্দিষ্ট নয়, তবে অন্য জ্বরজনিত রোগ বাদ দিতে সহায়ক হতে পারে। তাই চিকিৎসক যদি রক্ত কালচার করার পরামর্শ দেন, তা এড়িয়ে শুধু Widal টেস্টের ওপর নির্ভর না করাই ভালো।

চিকিৎসা: অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ কেন উদ্বেগের বিষয়

টাইফয়েডের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়, এবং কোনটি ব্যবহার হবে তা নির্ভর করে স্থানীয় প্রতিরোধ-ক্ষমতার (resistance pattern) ওপর—তাই স্ব-চিকিৎসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশে ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরের এক পর্যবেক্ষণে ১২,৪৩৫টি কালচার-নিশ্চিত টাইফয়েড কেসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মাল্টিড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স (MDR) ১৯৯৯ সালের ৩৮% থেকে কমে ২০২২ সালে ১৭%-এ নেমেছে—এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু একইসঙ্গে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সিপ্রোফ্লক্সাসিনের প্রতি অসংবেদনশীলতা (non-susceptibility) এখনো ৯০%-এর বেশি রয়ে গেছে, অর্থাৎ এই ওষুধ এখন আর অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। আজিথ্রোমাইসিন-প্রতিরোধী স্ট্রেইনও বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে শনাক্ত হয়েছে। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানে ইতিমধ্যে "এক্সটেনসিভলি ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট" (XDR) টাইফয়েড স্ট্রেইন ছড়িয়ে পড়েছে, যা প্রায় সব মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী এবং যার চিকিৎসায় কার্বাপেনেম-জাতীয় শিরায় দেওয়া ওষুধ প্রয়োজন হয়। এই কারণেই চিকিৎসক প্রায়ই সেফট্রায়াক্সোন বা সেফিক্সিমের মতো তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন অথবা আজিথ্রোমাইসিন বেছে নেন, তবে সঠিক ওষুধ ও মাত্রা নির্ধারণ একান্তই চিকিৎসকের বিষয়—রক্ত কালচার রিপোর্ট ও সংবেদনশীলতা পরীক্ষার (sensitivity test) ফলাফল অনুযায়ী এটি ঠিক করা উচিত।

ঘরোয়া যত্ন ও সাধারণ পরিচর্যা

হালকা উপসর্গ থাকা অবস্থায় চিকিৎসকের নির্দেশনায় বাড়িতে যত্ন নেওয়া যেতে পারে:

  • প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ, ফুটানো বা বিশুদ্ধ পানি এবং ওরাল স্যালাইন পান করা, বিশেষত ডায়রিয়া বা বমি থাকলে
  • জ্বর ও ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মতো প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে; নিজে থেকে অ্যাসপিরিন বা অন্য কোনো ব্যথানাশক নেওয়া উচিত নয়
  • সহজপাচ্য, নরম খাবার (খিচুড়ি, সুজি, স্যুপ জাতীয় খাবার) খাওয়া, তেল-মশলাযুক্ত ও শক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
  • পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া এবং চিকিৎসক নির্ধারিত পুরো অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ করা—মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে জীবাণু আরও প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে বা রোগ পুনরায় ফিরে আসতে (relapse) পারে
  • রোগীর ব্যবহৃত টয়লেট পরিষ্কার রাখা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস মেনে চলা, যাতে পরিবারের অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ না ছড়ায়
  • শুধু ঘরোয়া যত্নে ভরসা না করে নিয়মিত চিকিৎসকের ফলোআপে থাকা—জ্বর কমে যাওয়ার পরও শরীরে দুর্বলতা কিছুদিন থাকতে পারে, যা স্বাভাবিক, তবে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জানানো উচিত

মনে রাখা জরুরি, টাইফয়েড নিজে থেকে নির্ণয় বা চিকিৎসা করার চেষ্টা না করে সবসময় যোগ্য চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ, বিশেষত এই রোগে অ্যান্টিবায়োটিক নির্বাচন ভুল হলে জটিলতা বা প্রতিরোধ-ক্ষমতা তৈরির ঝুঁকি থাকে।

বিশেষ বিবেচনা: শিশু, গর্ভবতী মা ও বয়স্করা

শিশু: বাংলাদেশে টাইফয়েডজনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৮%-ই শিশু, তাই শিশুদের জ্বর দীর্ঘস্থায়ী হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কখনো কখনো কম স্পষ্ট থাকতে পারে, যা রোগ নির্ণয়ে দেরি করিয়ে দিতে পারে।

গর্ভবতী মা: গর্ভাবস্থায় টাইফয়েড হলে জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং কিছু অ্যান্টিবায়োটিক গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নাও হতে পারে—তাই স্ব-চিকিৎসা না করে অবশ্যই চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

বয়স্ক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তরা (ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ইত্যাদি): এদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে বলে প্রাথমিক পর্যায়ে হাসপাতালে পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

সেরে ওঠার পরও কি জীবাণু শরীরে থেকে যেতে পারে?

হ্যাঁ। চিকিৎসার পরও কিছু ক্ষেত্রে সালমোনেলা টাইফি জীবাণু পিত্তথলিতে (gallbladder) থেকে যেতে পারে এবং ব্যক্তি উপসর্গহীন হলেও তার শরীর থেকে ৩ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত জীবাণু ছড়াতে পারে—একে বলা হয় "স্বাস্থ্যবান বাহক" (healthy carrier) অবস্থা। এ কারণে খাদ্য পরিবেশনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সুস্থ হওয়ার পরও নিয়ম মেনে পরীক্ষা করানো ও হাইজিন মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া চিকিৎসা অসম্পূর্ণ থাকলে রোগ পুনরায় দেখা দিতে পারে (relapse), যার চিকিৎসা মূল অসুস্থতার মতোই করা হয়।

প্রতিরোধ: TCV টিকা ও নিরাপদ জীবনযাপন

২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাংলাদেশে সম্পন্ন হওয়া জাতীয় TCV ক্যাম্পেইন দুই ধাপে পরিচালিত হয়—১২ থেকে ৩০ অক্টোবর স্কুলভিত্তিক পর্যায়ে (প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও ইংরেজি মাধ্যম প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে) এবং ১ থেকে ১৩ নভেম্বর কমিউনিটিভিত্তিক পর্যায়ে (EPI কেন্দ্র ও প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার আউটরিচ সাইটে)। ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের একটি মাত্র ডোজে টিকা দেওয়া হয়েছে, এবং ২০২৬ থেকে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এটি নিয়মিত EPI সময়সূচির অংশ হয়ে যাচ্ছে। যেসব শিশু এই ক্যাম্পেইনে টিকা মিস করেছে, তাদের নিকটস্থ EPI কেন্দ্রে যোগাযোগ করে টিকার সুযোগ আছে কিনা জেনে নেওয়া উচিত।

এই টিকা কতদিন সুরক্ষা দেয়, তা নিয়ে বাংলাদেশি শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি বড় গবেষণা (TyVOID ট্রায়াল, দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত) দেখিয়েছে যে একটি মাত্র ডোজ Vi-টিটেনাস টক্সয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন কমপক্ষে ৫ বছর পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ট্রায়ালের তথ্য অনুযায়ী, এক ডোজ টিকা প্রায় ৪ বছর পর্যন্ত ৭৮%-এর কাছাকাছি কার্যকারিতা দেখিয়েছে, বছরে গড়ে মাত্র সামান্য পরিমাণে (প্রায় ১.৩%) কার্যকারিতা কমে। এ কারণেই WHO টাইফয়েড-প্রবণ দেশগুলোতে একক ডোজে এই টিকা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করে।

টিকার পাশাপাশি নিচের সাধারণ সতর্কতাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ:

  • ফুটানো বা নিরাপদ উৎসের পানি পান করা
  • বাইরের কাটা ফল, শরবত বা খোলা রাখা খাবার এড়িয়ে চলা
  • খাবার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়া
  • রান্নাঘর ও খাবার তৈরির জায়গা পরিষ্কার রাখা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা
  • সবজি ও ফল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া

তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক গবেষণা তথ্য অনুসরণে লেখা।

Frequently Asked Questions

টাইফয়েড জ্বর কীভাবে ছড়ায়?
দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে সালমোনেলা টাইফি জীবাণু মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মলে থাকা জীবাণু পানি বা খাবার দূষিত করলে তা থেকে অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে।
টাইফয়েডের প্রথম লক্ষণ কী?
সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা জ্বর (প্রতিদিন আগের দিনের চেয়ে বেশি), তীব্র মাথাব্যথা, সর্বাঙ্গে ব্যথা ও দুর্বলতা প্রথম সপ্তাহের প্রধান লক্ষণ। জ্বরের তুলনায় হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক কম থাকতে পারে।
Widal টেস্ট দিয়ে কি টাইফয়েড নিশ্চিতভাবে ধরা যায়?
না। Widal টেস্ট ক্রস-রিঅ্যাকশনের কারণে ভুল ফল দিতে পারে বলে এটি একা নির্ভরযোগ্য নয়। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা হলো ব্লাড কালচার, বিশেষত অসুস্থতার প্রথম সপ্তাহে করালে।
টাইফয়েড আর ডেঙ্গুর মধ্যে পার্থক্য কীভাবে বুঝব?
টাইফয়েডে জ্বর ধীরে ধীরে বাড়ে এবং সঙ্গে পেটের সমস্যা (কোষ্ঠকাঠিন্য বা ডায়রিয়া) থাকে, আর ডেঙ্গুতে হঠাৎ তীব্র জ্বর ওঠে সঙ্গে থাকে তীব্র গাঁটে-মাংসপেশিতে ব্যথা ও র‍্যাশ। নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষা করানো ভালো।
চিকিৎসা না করালে টাইফয়েডের কী জটিলতা হতে পারে?
চিকিৎসা না করালে তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যাওয়া, অন্ত্রে রক্তক্ষরণ বা মস্তিষ্কে প্রভাবের মতো গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। অন্ত্র ছিদ্র প্রায় ১-২% রোগীর ক্ষেত্রে ঘটে।
TCV টিকা কারা পেয়েছে এবং কীভাবে পাওয়া যাবে?
২০২৫ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে দেশব্যাপী ক্যাম্পেইনে ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সী প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ শিশুকে এক ডোজ TCV টিকা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ থেকে এটি এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নিয়মিত EPI সময়সূচির অংশ। মিস করলে নিকটস্থ EPI কেন্দ্রে যোগাযোগ করা যায়।
টাইফয়েড সেরে যাওয়ার পরও কি জীবাণু শরীরে থেকে যেতে পারে?
হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে জীবাণু পিত্তথলিতে থেকে যায় এবং ব্যক্তি উপসর্গহীন হলেও ৩-১২ মাস পর্যন্ত জীবাণু ছড়াতে পারে, একে "স্বাস্থ্যবান বাহক" অবস্থা বলা হয়।
টাইফয়েড প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরি অভ্যাস কী?
নিরাপদ ফুটানো পানি পান করা, বাইরের কাটা ফল বা খোলা খাবার এড়িয়ে চলা, খাবার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং TCV টিকা গ্রহণ করা।
Share:

Comments

No comments yet. Be the first to comment.

Leave a comment

Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.

Never published

Published after review.

More news