osudhkosh
New

চিকুনগুনিয়া: লক্ষণ, ডেঙ্গুর সাথে পার্থক্য, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

Published: September 24, 2026

Share:
চিকুনগুনিয়া: লক্ষণ, ডেঙ্গুর সাথে পার্থক্য, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে — স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) হিসাবে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৪৯ জনের এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫১,৮৩৭ জন, যার মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই মারা গেছেন ৫২ জন — এ বছরের সর্বোচ্চ মাসিক মৃত্যুহার। কিন্তু ডেঙ্গু ছড়ানো এই একই এডিস (Aedes) মশা আরেকটি ভাইরাসও বহন করে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনো অনেক কম — চিকুনগুনিয়া। ২০১৭ সালের বড় প্রকোপের পর কয়েক বছর নিভৃতে থাকা এই রোগ ২০২৪ সালের শেষ দিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বরে ঢাকায় RT-PCR-নিশ্চিত ১৩৮টি কেস) ফিরে আসে, আর ২০২৫ সালে তা আরও ছড়িয়ে পড়ে — শুধু ঢাকাতেই জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ৭৩২টি সন্দেহভাজন কেসের মধ্যে ৪০০টি ল্যাব-নিশ্চিত হয়, আর চট্টগ্রামে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত প্রায় ২,৭০০ কেস রিপোর্ট হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে যুক্তরাষ্ট্রের CDC বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ ট্রাভেল নোটিশ জারি করে।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া — দুটোই একই মশা থেকে ছড়ায়, লক্ষণও অনেকটা কাছাকাছি, ফলে দুটোকে গুলিয়ে ফেলা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু চিকিৎসা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দিক থেকে দুটোর পার্থক্য বোঝা জরুরি। এই লেখায় চিকুনগুনিয়ার কারণ, লক্ষণ, ডেঙ্গুর সাথে পার্থক্য, জটিলতা, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

চিকুনগুনিয়া কী এবং কীভাবে ছড়ায়?

চিকুনগুনিয়া একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা চিকুনগুনিয়া ভাইরাস (CHIKV) দ্বারা সৃষ্ট। এটি প্রধানত এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) ও এডিস অ্যালবোপিকটাস (Aedes albopictus) মশার কামড়ে ছড়ায় — এই দুটি মশাই ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্যও দায়ী। এই মশাগুলো সাধারণত দিনের বেলা, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বেশি সক্রিয় থাকে এবং পরিষ্কার জমা পানিতে (ফুলের টব, এসির পানি, টায়ার, পানির ট্যাংকের ঢাকনাবিহীন অংশ) ডিম পাড়ে।

সংক্রমিত মশা কামড়ানোর পর সাধারণত ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যে (কারও কারও ক্ষেত্রে ২ দিনের মধ্যেই) লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। চিকুনগুনিয়া সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না — শুধুমাত্র সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমেই এটি ছড়ায়। তবে গর্ভবতী মা প্রসবের ঠিক আগে বা সময়ে আক্রান্ত থাকলে সন্তানের শরীরে ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

মজার বিষয় হলো, "চিকুনগুনিয়া" নামটি এসেছে তানজানিয়ার কিমাকোন্দে (Kimakonde) ভাষা থেকে, যার অর্থ মোটামুটি "যা শরীরকে বাঁকিয়ে দেয়" — জয়েন্টের তীব্র ব্যথার কারণে রোগীরা প্রায়ই কুঁজো হয়ে হাঁটেন বলে এই নামকরণ, যা রোগটির সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপসর্গকেই তুলে ধরে।

চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ

চিকুনগুনিয়ার সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ হলো আকস্মিক তীব্র জ্বর ও অসহনীয় জয়েন্টের ব্যথা। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:

  • আকস্মিক উচ্চ জ্বর — সাধারণত ৩৯°সে (১০২°ফা) বা তার বেশি
  • তীব্র জয়েন্টের ব্যথা (আর্থ্রালজিয়া) — এটিই চিকুনগুনিয়ার প্রধান ও সবচেয়ে কষ্টদায়ক লক্ষণ; সাধারণত একাধিক জয়েন্টে, দুই পাশে সমানভাবে (symmetric) দেখা দেয় — হাতের আঙুল, কব্জি, কনুই, হাঁটু, গোড়ালির জয়েন্টে
  • জয়েন্টে ফোলাভাব
  • মাংসপেশিতে ব্যথা
  • মাথাব্যথা
  • শরীরে ফুসকুড়ি (maculopapular rash), সাধারণত শরীর ও হাত-পায়ে
  • বমি বমি ভাব ও ক্লান্তি

বেশিরভাগ রোগীর জ্বর এক সপ্তাহের মধ্যে ভালো হয়ে যায় এবং সাধারণ অবস্থার উন্নতি হয়। তবে চিকুনগুনিয়ার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো — জ্বর কমে গেলেও জয়েন্টের ব্যথা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন থেকে যায়, যা রোগীদের দৈনন্দিন কাজকর্মে মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

ডেঙ্গু নাকি চিকুনগুনিয়া? পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন

একই মশা থেকে ছড়ানো এবং জ্বর-শরীরব্যথার মতো উপসর্গ থাকায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া অনেক সময় বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়:

  • জয়েন্টের ব্যথার তীব্রতা: চিকুনগুনিয়ায় জয়েন্টের ব্যথা অনেক বেশি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা রোগীকে প্রায় নড়াচড়া করতে না দেওয়ার মতো কষ্টদায়ক হতে পারে। ডেঙ্গুতে সাধারণত সারা শরীরে ও হাড়ে ব্যথা (তথাকথিত "ব্রেকবোন ফিভার") থাকে, কিন্তু জয়েন্ট-কেন্দ্রিক তীব্রতা তুলনামূলক কম।
  • চোখের পেছনে ব্যথা: ডেঙ্গুতে চোখের পেছনে ব্যথা (retro-orbital pain) সাধারণ একটি লক্ষণ, যা চিকুনগুনিয়ায় সচরাচর দেখা যায় না।
  • পেটের উপসর্গ: ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
  • প্লাটিলেট ও রক্তক্ষরণ ঝুঁকি: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকারী বিষয়। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট দ্রুত কমে যেতে পারে এবং রক্তক্ষরণজনিত জটিলতা (severe dengue) তৈরি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লাটিলেট কাউন্ট ১,১৮,০০০ (১.১৮ লাখ)-এর নিচে নেমে গেলে সেটি ডেঙ্গুর পক্ষে প্রায় ৮৯% নির্ভুল ইঙ্গিত দেয়, যেখানে চিকুনগুনিয়ায় সাধারণত এমন মারাত্মক প্লাটিলেট হ্রাস বা রক্তক্ষরণজনিত জটিলতা দেখা যায় না।
  • জ্বরের স্থায়িত্ব: চিকুনগুনিয়ায় জ্বর সাধারণত দ্রুত (২-৩ দিনে) কমে আসে, কিন্তু জয়েন্টের ব্যথা রয়ে যায়। ডেঙ্গুতে জ্বর সাধারণত ৫-৭ দিন স্থায়ী হতে পারে এবং অনেক সময় দুই দফায় (biphasic/saddleback fever) আসে।

যেহেতু ক্লিনিক্যাল লক্ষণ দিয়ে দুটো রোগ নিশ্চিতভাবে আলাদা করা কঠিন এবং একই এলাকায় দুটো ভাইরাসের সহাবস্থান (co-circulation) সম্ভব, তাই জ্বর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত — নিজে নিজে অনুমান করে ওষুধ খাওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি।

জটিলতা: দীর্ঘমেয়াদী জয়েন্টের ব্যথা (ক্রনিক চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস)

চিকুনগুনিয়ার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও CDC-র তথ্যমতে, প্রায় ১০-১২% রোগীর ক্ষেত্রে জয়েন্টের ব্যথা মাসের পর মাস স্থায়ী হতে পারে, আর বিভিন্ন গবেষণা-কোহর্টে এই হার আরও বেশি — ২০-৪০% পর্যন্ত, কোনো কোনো গবেষণায় তা ৫০% পর্যন্তও দেখা গেছে। জয়েন্টের ব্যথা ও প্রদাহ যখন ১২ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তখন তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে "ক্রনিক চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস (CCA)" বলা হয়, যা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো উপসর্গ তৈরি করতে পারে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে বছরের পর বছর স্থায়ী হতে পারে।

এছাড়া বিরল হলেও কিছু গুরুতর জটিলতা হতে পারে — বিশেষত নবজাতক, বয়স্ক ও অন্যান্য জটিল রোগে (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদরোগ) আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্নায়বিক জটিলতা, চোখের প্রদাহ বা হৃদযন্ত্রের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশেই ২০২৫ সালের প্রকোপের সময় পরিচালিত একটি হাসপাতালভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফলোআপে থাকা রোগীদের মধ্যে ৮১%-এরও বেশি রোগীর উপসর্গ দীর্ঘ সময় ধরে থেকে গিয়েছিল, এবং গড়ে প্রতিজন রোগী চিকুনগুনিয়ার কারণে প্রায় সাড়ে ১০ কর্মদিবস হারিয়েছেন। অর্থাৎ এটি শুধু কয়েকদিনের জ্বর নয়, বরং কর্মক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মানের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি রোগ। জয়েন্টের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৪% রোগী গড়ে ১৪১ দিনের মধ্যে সেরে উঠলেও, বাকি ৫৬% রোগীর মধ্যে অক্ষমতা ১ থেকে ৩ বছর পর্যন্ত থেকে গিয়েছিল।

নির্ণয়ের জন্য কোন পরীক্ষা প্রয়োজন?

চিকুনগুনিয়া নিশ্চিত করার জন্য মূলত দুই ধরনের পরীক্ষা করা হয়:

  • RT-PCR পরীক্ষা: জ্বর শুরুর প্রথম ৫-৭ দিনের মধ্যে (যখন রক্তে ভাইরাস উপস্থিত থাকে) এই পরীক্ষায় সরাসরি ভাইরাস শনাক্ত করা যায়। এটি প্রাথমিক পর্যায়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা।
  • IgM অ্যান্টিবডি (ELISA) পরীক্ষা: জ্বর শুরুর এক সপ্তাহ পর থেকে শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি শনাক্ত করা যায়, যা প্রায় ২ মাস পর্যন্ত রক্তে সনাক্তযোগ্য থাকে।

সাধারণ CBC (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষায় চিকুনগুনিয়ায় প্লাটিলেট সাধারণত স্বাভাবিক বা সামান্য কম থাকে — ডেঙ্গুর মতো তীব্রভাবে কমে যায় না, যা রোগ নির্ণয়ে সহায়ক একটি ইঙ্গিত হতে পারে। বাংলাদেশে IEDCR, DGHS-অনুমোদিত ল্যাব এবং কিছু বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এই পরীক্ষাগুলো করা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক পরীক্ষা করানো জরুরি।

চিকিৎসা ও ঘরোয়া যত্ন

চিকুনগুনিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ এখনো নেই — চিকিৎসা মূলত উপসর্গ-নির্ভর (supportive care):

  • পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
  • প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও পানি পান করুন, যাতে ডিহাইড্রেশন না হয়
  • জ্বর ও ব্যথা কমাতে প্যারাসিটামল (যেমন Napa, Paracetamol) জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে দৈনিক সর্বোচ্চ নিরাপদ মাত্রা মেনে চলা এবং চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
  • অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: ডেঙ্গু নিশ্চিতভাবে বাদ না দেওয়া পর্যন্ত অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো NSAID গোত্রের ব্যথানাশক এড়িয়ে চলুন — কারণ যদি প্রকৃতপক্ষে রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত থাকেন, তাহলে এই ওষুধগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে

জ্বর সেরে যাওয়ার পরও জয়েন্টের ব্যথা ৩ মাসের বেশি স্থায়ী হলে (ক্রনিক চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস), তখন চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে NSAID ব্যবহার করা যেতে পারে, এবং গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষেত্রে স্বল্প-মেয়াদী কম মাত্রার কর্টিকোস্টেরয়েড বিবেচনা করা হতে পারে। এই পর্যায়ে রিউমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া এবং ফিজিওথেরাপি শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো অন্য কোনো কারণ বাদ দেওয়া যায় এবং সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা যায়।

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন

নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দেরি না করে হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:

  • নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি (৬৫ বছরের বেশি), গর্ভবতী মা বা ডায়াবেটিস/উচ্চ রক্তচাপ/হৃদরোগ/কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর হলে
  • তীব্র জ্বর কয়েকদিনেও না কমলে
  • শরীরে কোনো ধরনের রক্তক্ষরণের লক্ষণ (নাক-মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, শরীরে কালচে দাগ) দেখা দিলে — এটি ডেঙ্গু বা মিশ্র সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে
  • তীব্র পানিশূন্যতা, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা দুর্বলতা বেড়ে গেলে
  • শ্বাসকষ্ট বা বুকে ব্যথা হলে
  • জ্ঞানের পরিবর্তন বা প্রচণ্ড মাথাব্যথা হলে
  • জয়েন্টের ব্যথা এত তীব্র হয়ে ওঠে যে দৈনন্দিন কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না

বিশেষ সতর্কতা: শিশু, গর্ভবতী মা ও বয়স্করা

নবজাতক যদি প্রসবের ঠিক আগে বা সময়ে মায়ের কাছ থেকে ভাইরাসে সংক্রমিত হয়, তাহলে তাদের মধ্যে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই এমন ক্ষেত্রে নবজাতককে অবশ্যই ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত। গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বয়স্ক ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদী রোগে (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদরোগ) আক্রান্তদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, তাই তাদের ক্ষেত্রে সামান্য উপসর্গেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং স্ব-চিকিৎসা এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রতিরোধ: মশা নিয়ন্ত্রণই মূল অস্ত্র

যেহেতু চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু একই মশা থেকে ছড়ায়, তাই প্রতিরোধের উপায়ও একই — এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা:

  • বাড়ির আশেপাশে ফুলের টব, ভাঙা টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, এসির ট্রে বা ছাদে জমে থাকা পরিষ্কার পানি সপ্তাহে অন্তত একবার ফেলে দিন বা শুকিয়ে নিন
  • পানির ট্যাংক ও পাত্র ঢেকে রাখুন
  • দিনের বেলা (বিশেষত সকাল ও বিকেলে) মশা তাড়ানোর ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার করুন, কারণ এডিস মশা প্রধানত দিনে কামড়ায়
  • ফুলহাতা জামা ও ফুল-লেংথ প্যান্ট পরুন, বিশেষত মশাবাহিত রোগ বেশি এমন এলাকায়
  • জানালা-দরজায় মশারি নেট ব্যবহার করুন এবং ঘুমানোর সময় মশারি টাঙান
  • এলাকাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা অভিযানে অংশ নিন — স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালু আছে, যাতে সবার অংশগ্রহণ জরুরি

বিশ্বের কিছু দেশে চিকুনগুনিয়ার ভ্যাকসিন অনুমোদিত হলেও, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এখনো এটি অন্তর্ভুক্ত নেই। তাই আপাতত বাংলাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাই চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের প্রধান উপায়।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর নির্দেশিকা ও প্রকাশিত তথ্য অনুসরণে লেখা।

Frequently Asked Questions

চিকুনগুনিয়া কীভাবে ছড়ায়?
চিকুনগুনিয়া এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার কামড়ে ছড়ায়, যা ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্যও দায়ী মশা। এটি সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না, শুধু সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমেই সংক্রমিত হয়।
চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
চিকুনগুনিয়ায় জয়েন্টের ব্যথা অনেক বেশি তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, আর ডেঙ্গুতে চোখের পেছনে ব্যথা, পেটের সমস্যা ও প্লাটিলেট কমে যাওয়া বেশি দেখা যায়। প্লাটিলেট ১.১৮ লাখের নিচে নামলে সেটি ডেঙ্গুর দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে।
চিকুনগুনিয়ার জ্বর সাধারণত কতদিন থাকে?
চিকুনগুনিয়ার জ্বর সাধারণত দ্রুত, ২-৩ দিনের মধ্যে কমে আসে এবং বেশিরভাগ রোগী এক সপ্তাহের মধ্যে মোটামুটি সুস্থ বোধ করেন, তবে জয়েন্টের ব্যথা এরপরও চলতে পারে।
চিকুনগুনিয়ায় জয়েন্টের ব্যথা কতদিন স্থায়ী হতে পারে?
বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ১-২ সপ্তাহে ব্যথা কমে যায়, তবে প্রায় ১০-১২% থেকে কোনো কোনো গবেষণায় ২০-৪০% রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথা ৩ মাসের বেশি স্থায়ী হতে পারে, যাকে ক্রনিক চিকুনগুনিয়া আর্থ্রাইটিস বলা হয় এবং তা বছরের পর বছরও থাকতে পারে।
চিকুনগুনিয়ায় কি অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন খাওয়া যাবে?
ডেঙ্গু নিশ্চিতভাবে বাদ না দেওয়া পর্যন্ত অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো NSAID ব্যথানাশক এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ ডেঙ্গু হলে এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর ও ব্যথায় প্রাথমিকভাবে প্যারাসিটামল ব্যবহার করা নিরাপদ, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
চিকুনগুনিয়া নির্ণয়ে কোন পরীক্ষা করা হয়?
জ্বরের প্রথম ৫-৭ দিনে RT-PCR পরীক্ষা এবং এক সপ্তাহ পর থেকে IgM অ্যান্টিবডি (ELISA) পরীক্ষার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া নিশ্চিত করা যায়। এই পরীক্ষাগুলো বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ল্যাবে পাওয়া যায়।
চিকুনগুনিয়ার কোনো ভ্যাকসিন কি বাংলাদেশে পাওয়া যায়?
বিশ্বের কিছু দেশে চিকুনগুনিয়ার ভ্যাকসিন অনুমোদিত হলেও, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে এটি এখনো অন্তর্ভুক্ত নেই। তাই মশা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাই আপাতত প্রধান প্রতিরোধ উপায়।
গর্ভবতী মা বা নবজাতকের জন্য চিকুনগুনিয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
গর্ভবতী মা প্রসবের ঠিক আগে বা সময়ে আক্রান্ত হলে নবজাতকের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকে। তাই গর্ভাবস্থায় জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি এবং সংক্রমিত মায়ের নবজাতককে ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে রাখা উচিত।
Share:

Comments

No comments yet. Be the first to comment.

Leave a comment

Please don't ask for or give personal medical advice in comments — consult a registered physician for your specific situation.

Never published

Published after review.

More news