বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতা: লক্ষণ, কারণ ও চিকিৎসার সম্পূর্ণ গাইড
প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনও সহজ নয়, কিন্তু সংখ্যাগুলো বলছে সমস্যাটি কতটা বিস্তৃত। ২০২২ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS)-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের মধ্যে প্রায় ৫% মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতার লক্ষণ এবং প্রায় ৪% মাঝারি থেকে তীব্র উদ্বিগ্নতার লক্ষণে ভুগছেন। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই লক্ষণযুক্ত নারীদের মধ্যে মাত্র ২২% কোনো চিকিৎসা-সহায়তা নিয়েছেন এবং মাত্র ৮% ওষুধ গ্রহণ করেছেন। তরুণদের অবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ—২০২৪ সালে ঢাকার ৫৬৩ জন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীর (বয়স ১৩-১৮) ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৬.৫% শিক্ষার্থী মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতায় এবং ১৮.১% উদ্বিগ্নতায় আক্রান্ত। অন্য একটি গবেষণায় ৭৩৮ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা ও মানসিক চাপের হার ২৫% থেকে ৭১% পর্যন্ত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সমস্যাটি বিরল নয়—বরং চিকিৎসা না নেওয়াটাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এই লেখায় বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতার লক্ষণ, কারণ, রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড, ঘরোয়া পরিচর্যা, চিকিৎসা এবং বাংলাদেশে কোথায় সহায়তা পাওয়া যায়—সবকিছু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতা কী, এবং কেন হয়
বিষণ্নতা (Depression) এবং উদ্বিগ্নতা (Anxiety Disorder) দুটি আলাদা কিন্তু প্রায়ই একসঙ্গে দেখা যাওয়া মানসিক অবস্থা। এগুলো সাময়িক মন খারাপ বা স্বাভাবিক দুশ্চিন্তার চেয়ে ভিন্ন—এগুলো দীর্ঘস্থায়ী, কার্যকারিতাকে ব্যাহত করে এবং চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাস ICD-11 অনুযায়ী, এগুলোর পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং জৈবিক, মানসিক ও সামাজিক—এই তিন ধরনের কারণ একসঙ্গে কাজ করে:
- জৈবিক কারণ: মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার (যেমন সেরোটোনিন, নরএপিনেফ্রিন)-এর ভারসাম্যহীনতা, পরিবারে বিষণ্নতা/উদ্বিগ্নতার ইতিহাস, থাইরয়েড সমস্যা বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ।
- মানসিক কারণ: নেতিবাচক চিন্তাধারা, অতিরিক্ত আত্মসমালোচনা, শৈশবের মানসিক আঘাত (trauma)।
- সামাজিক কারণ: আর্থিক সংকট, পরীক্ষা বা কর্মক্ষেত্রের চাপ, সম্পর্কের জটিলতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার সঙ্গে বসবাস।
সাধারণত এই কারণগুলোর সংমিশ্রণেই একজন ব্যক্তি ঝুঁকিতে পড়েন—একটিমাত্র কারণে সবসময় রোগ হয় না।
লক্ষণ বিস্তারিত
বিষণ্নতার লক্ষণ
আন্তর্জাতিক রোগ শ্রেণিবিন্যাস ICD-11 অনুযায়ী, বিষণ্নতার মূল লক্ষণ হলো—কমপক্ষে দুই সপ্তাহ ধরে স্থায়ী মনখারাপ বা আগ্রহ-আনন্দ কমে যাওয়া, এর সাথে নিচের লক্ষণগুলোর কয়েকটি:
- মনোযোগ দিতে সমস্যা বা সিদ্ধান্তহীনতা
- অতিরিক্ত আত্মসমালোচনা, অপরাধবোধ বা নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া
- ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা
- ঘুম বেশি বা কম হওয়া, ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
- কাজে-কথায় ধীরগতি বা অস্থিরতা (psychomotor change)
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শক্তিহীনতা
- মৃত্যু বা আত্মহত্যা নিয়ে বারবার চিন্তা
DSM-5-TR মানদণ্ড অনুযায়ী, একই দুই সপ্তাহের মধ্যে ৯টি নির্ধারিত লক্ষণের মধ্যে অন্তত ৫টি (যার একটি অবশ্যই মনখারাপ বা আগ্রহ কমে যাওয়া) থাকলে একে "মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার" বলা হয়। ICD-11 অনুযায়ী উপসর্গের তীব্রতা ও দৈনন্দিন কাজে প্রভাবের ভিত্তিতে এটিকে মৃদু, মাঝারি বা তীব্র হিসেবে ভাগ করা হয়।
উদ্বিগ্নতার লক্ষণ
উদ্বিগ্নতার ক্ষেত্রে মূল পার্থক্যকারী বিষয় হলো সময়কাল। সাধারণ দুশ্চিন্তা ঘণ্টা বা দিনের মধ্যে কমে যায়, কিন্তু জেনারেলাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার নির্ণয়ের জন্য DSM-5 অনুযায়ী অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা অন্তত ৬ মাস ধরে থাকতে হয় (ICD-11-এ বলা হয়েছে "কয়েক মাস ধরে")। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- প্রায় সবকিছু নিয়ে অতিরিক্ত, নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন দুশ্চিন্তা
- অস্থিরতা, সবসময় সতর্ক বা "কিনারে আছি" অনুভূতি
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা, হাত-পা ঘামা
- পেশিতে টান বা ব্যথা
- ঘুমের সমস্যা
- সহজে বিরক্ত হওয়া, মনোযোগে সমস্যা
অনেক ক্ষেত্রে বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতা একসঙ্গে দেখা যায়—ICD-11-এ এই মিশ্র অবস্থার জন্য আলাদা একটি শ্রেণি ("মিক্সড অ্যাংজাইটি অ্যান্ড ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার") রাখা হয়েছে, কারণ প্রাইমারি কেয়ারে এই মিশ্র ধরনটাই বেশি দেখা যায়।
সাধারণ মন খারাপ নাকি রোগ—পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন
পরীক্ষার আগে নার্ভাস লাগা বা কোনো দুঃসংবাদে কয়েক দিন মন খারাপ থাকা স্বাভাবিক—এটি রোগ নয়। পার্থক্যকারী তিনটি বিষয় মনে রাখা জরুরি:
- সময়কাল: বিষণ্নতার লক্ষণ ২ সপ্তাহের বেশি এবং উদ্বিগ্নতার লক্ষণ কয়েক মাস ধরে থাকলে এটি স্বাভাবিক সীমা পার করেছে বলে ধরা হয়।
- তীব্রতা: লক্ষণগুলো কি দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা বা সম্পর্কে বাধা দিচ্ছে?
- নিয়ন্ত্রণের অভাব: চেষ্টা করেও দুশ্চিন্তা বা মনখারাপ নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে প্রায়ই নিজের লক্ষণ বুঝতে পারেন না বা বাইরের দুনিয়া থেকে সরে যাওয়াকেই স্বাভাবিক মনে করেন। এজন্য পরিবার ও কাছের মানুষদের আচরণের পরিবর্তনে সচেতন থাকা জরুরি—যেমন কেউ আগে যা উপভোগ করতেন তা এখন করছেন না, মানুষের সাথে মেশা কমিয়ে দিয়েছেন, বা হঠাৎ অস্বাভাবিক নিরবতা দেখাচ্ছেন।
বিপদচিহ্ন—যখন জরুরি সহায়তা প্রয়োজন
নিচের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে:
- আত্মহত্যা বা নিজেকে আঘাত করার চিন্তা আসা
- জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ আগ্রহ বা আশা হারিয়ে ফেলা
- খাওয়া-ঘুম প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বা স্বাভাবিক কাজকর্ম সম্পূর্ণ ব্যাহত হওয়া
- প্যানিক অ্যাটাক (আকস্মিক তীব্র ভয়, বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট) বারবার হওয়া
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: ২৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহে কিছুক্ষেত্রে উপসর্গ বা আত্মহত্যার চিন্তা সাময়িকভাবে বাড়তে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে—তাই এই বয়সীদের চিকিৎসা শুরুর পর চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ আবশ্যক। আত্মহত্যার চিন্তা এলে তা কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়—সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কাউকে বলা এবং হেল্পলাইনে যোগাযোগ করা জরুরি।
রোগ নির্ণয় কীভাবে করা হয়
বিষণ্নতা বা উদ্বিগ্নতার নির্দিষ্ট কোনো রক্ত পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সাধারণত বিস্তারিত কথা বলে উপসর্গের ধরন, সময়কাল ও তীব্রতা যাচাই করেন। প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রচলিত দুটি সংক্ষিপ্ত প্রশ্নপত্র ব্যবহৃত হয়—বিষণ্নতার জন্য PHQ-9 এবং উদ্বিগ্নতার জন্য GAD-7। এই প্রশ্নপত্রগুলো প্রায় ৮৫-৯০% নির্ভরযোগ্যতায় ক্লিনিকাল ইন্টারভিউয়ের ফলাফলের সাথে মিলে যায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে, যদিও এগুলো একা দিয়ে নিশ্চিত নির্ণয় করা হয় না—এর সাথে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন। এছাড়া থাইরয়েড সমস্যা, রক্তস্বল্পতা বা ভিটামিন ঘাটতির মতো শারীরিক কারণ বিষণ্নতার মতো লক্ষণ তৈরি করতে পারে কি না, তা বাতিল করার জন্য কিছু রক্ত পরীক্ষাও করা হতে পারে।
ঘরোয়া পরিচর্যা ও জীবনযাপনে পরিবর্তন
মৃদু থেকে মাঝারি উপসর্গে নিচের অভ্যাসগুলো সহায়ক হতে পারে, তবে এগুলো পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প নয়:
- নিয়মিত ঘুম: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো-ওঠা, স্ক্রিন টাইম কমানো।
- শারীরিক কার্যকলাপ: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যে সহায়ক।
- সামাজিক সংযোগ: বিচ্ছিন্ন না থেকে পরিবার, বন্ধু বা বিশ্বাসযোগ্য মানুষের সাথে কথা বলা।
- শ্বাস-প্রশ্বাস ও মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন: উদ্বিগ্নতার তীব্র মুহূর্তে ধীর, গভীর শ্বাস নেওয়া স্নায়ুতন্ত্র শান্ত করতে সাহায্য করে।
- ক্যাফেইন ও নিকোটিন সীমিত করা: অতিরিক্ত চা-কফি উদ্বিগ্নতার লক্ষণ বাড়াতে পারে।
লক্ষণ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, দৈনন্দিন কাজে বাধা দিলে, বা ঘরোয়া চেষ্টায় উন্নতি না হলে—পেশাদার সহায়তা নেওয়ার সময় এসেছে।
চিকিৎসা: কাউন্সেলিং, থেরাপি ও ওষুধ
বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতার চিকিৎসায় সাধারণত তিনটি পথ অনুসরণ করা হয়—একা বা সম্মিলিতভাবে:
- সাইকোথেরাপি/কাউন্সেলিং: কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) বিশেষভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত, যা সাধারণত ১০-২০টি সেশনে সম্পন্ন হয়। এতে নেতিবাচক চিন্তার ধারা চিহ্নিত করে তা বদলানোর কৌশল শেখানো হয়।
- ওষুধ: মাঝারি থেকে তীব্র ক্ষেত্রে চিকিৎসক SSRI (যেমন সারট্রালিন, ফ্লুওক্সেটিন, এসসিটালোপ্রাম জাতীয় সেরোটোনিন-নিয়ন্ত্রক ওষুধ) বা SNRI গোত্রের ওষুধ লিখতে পারেন। এই ওষুধ সম্পূর্ণ কার্যকর হতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং ডোজ, মেয়াদ ও বন্ধ করার পদ্ধতি সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হতে হবে—নিজে নিজে ওষুধ শুরু, পরিবর্তন বা বন্ধ করা উচিত নয়।
- সম্মিলিত চিকিৎসা: মাঝারি থেকে তীব্র ক্ষেত্রে থেরাপি ও ওষুধ একসাথে প্রায়ই সবচেয়ে বেশি কার্যকর বলে বিবেচিত হয়।
কোন চিকিৎসা পথ উপযুক্ত তা নির্ভর করে উপসর্গের তীব্রতা, সময়কাল এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর—এই সিদ্ধান্ত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা যোগ্য চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করেই নেওয়া উচিত।
বিশেষ বিবেচনা
- শিশু-কিশোর: স্কুলের চাপ, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব ও বুলিং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বিগ্নতা-বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ায় (যেমনটি ঢাকার স্কুল-শিক্ষার্থীদের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে)। আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন—পড়াশোনায় অনীহা, ঘরে বন্দি থাকা, খিটখিটে মেজাজ—এসব ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সতর্ক থাকা জরুরি।
- গর্ভবতী ও প্রসবোত্তর নারী: হরমোনের পরিবর্তনের কারণে এই সময়ে বিষণ্নতা-উদ্বিগ্নতার ঝুঁকি বেশি থাকে; ওষুধ গ্রহণের আগে গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদানের বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো অপরিহার্য।
- বয়স্ক ব্যক্তি: বয়স্কদের বিষণ্নতা অনেক সময় শুধু শারীরিক উপসর্গ (ক্লান্তি, ব্যথা, ঘুমের সমস্যা) হিসেবে প্রকাশ পায়, যা সহজে উপেক্ষিত হয়ে যায়।
- দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তরা: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সাথে বসবাসকারীদের মধ্যে বিষণ্নতার ঝুঁকি সাধারণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি থাকে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
প্রতিরোধ ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার উপায়
- নিয়মিত রুটিন বজায় রাখা—ঘুম, খাবার ও কাজের সময়ে শৃঙ্খলা
- সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা, বিচ্ছিন্ন না হওয়া
- মানসিক চাপ জমতে না দিয়ে সময়মতো কারো সাথে শেয়ার করা
- অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার সীমিত করা, বিশেষত ঘুমের আগে
- লক্ষণ প্রথম দিকে চিহ্নিত করে দেরি না করে সহায়তা নেওয়া—কারণ BDHS-এর তথ্য বলছে, লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ মানুষ চিকিৎসা নেন না
প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা
- "এটা দুর্বলতা, ইচ্ছাশক্তি দিয়ে কাটিয়ে ওঠা যায়" — এটি সঠিক নয়। বিষণ্নতা ও উদ্বিগ্নতা মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার সংক্রান্ত একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা, চরিত্রের দুর্বলতা নয়। শুধু ইচ্ছাশক্তি দিয়ে একে পুরোপুরি সারানো যায় না, ঠিক যেমন ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ শুধু ইচ্ছাশক্তিতে সারে না।
- "ওষুধ শুরু করলে সারাজীবন খেতে হবে" বা "ওষুধে নেশা হয়ে যায়" — SSRI/SNRI গোত্রের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ আসক্তি তৈরি করে না। চিকিৎসক সাধারণত লক্ষণ ভালো হওয়ার পরও কিছু মাস ওষুধ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে উপসর্গ ফিরে না আসে—তারপর ধীরে ধীরে, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো কমিয়ে বন্ধ করা হয়। আকস্মিকভাবে নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ করলে উপসর্গ ফিরে আসতে বা উইথড্রয়াল সমস্যা হতে পারে।
- "শুধু বড় কোনো দুর্ঘটনা বা শোকের পরই এটা হয়" — না, দৃশ্যমান কোনো বড় কারণ ছাড়াও জৈবিক ও মানসিক কারণে বিষণ্নতা-উদ্বিগ্নতা হতে পারে। বাইরে থেকে জীবন "স্বাভাবিক" দেখালেও ভেতরে সমস্যা থাকতে পারে।
- "মানসিক রোগের চিকিৎসক দেখানো মানে আমি পাগল" — মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সাইকোলজিস্টের কাছে যাওয়া অন্য কোনো চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মতোই স্বাভাবিক একটি পদক্ষেপ। সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে চিকিৎসা না নেওয়াই বাংলাদেশে বড় একটি বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে গবেষণায়।
বাংলাদেশে কোথায় সহায়তা পাবেন
বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) অধীনে ঢাকার শের-ই-বাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪০০-৫০০ জন রোগী বহির্বিভাগে সেবা নেন এবং শিশু-কিশোর, বয়স্ক, বিষণ্নতা, OCD ও মাদকাসক্তির জন্য আলাদা বিশেষায়িত ক্লিনিক রয়েছে। এছাড়া "কান পেতে রই" (Kaan Pete Roi) বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র টেলিফোন-ভিত্তিক মানসিক সহায়তা ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ হেল্পলাইন, যা সম্পূর্ণ গোপনীয় ও বিনামূল্যে প্রতিদিন দুপুর ৩টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত সেবা দেয়। জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এও যোগাযোগ করা যায়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (BDHS) ২০২২, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ICD-11 শ্রেণিবিন্যাস এবং আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের DSM-5-TR নির্দেশিকা অনুসরণে লেখা।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
বিষণ্নতা আর সাধারণ মন খারাপের মধ্যে পার্থক্য কী?
উদ্বিগ্নতা কতদিন থাকলে তা রোগ বলে গণ্য হয়?
বিষণ্নতা কি শুধু ওষুধেই সারে?
অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ শুরু করলে কি সারাজীবন খেতে হবে?
আত্মহত্যার চিন্তা আসলে কী করা উচিত?
কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বিগ্নতা-বিষণ্নতা কতটা বেশি দেখা যায়?
PHQ-9 ও GAD-7 কী এবং এগুলো কীভাবে ব্যবহৃত হয়?
বাংলাদেশে বিষণ্নতা-উদ্বিগ্নতার চিকিৎসার জন্য কোথায় যোগাযোগ করা যায়?
পাঠকের মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।


