osudhkosh

শয্যাক্ষত (বেডসোর): কারণ, ধাপ, প্রতিরোধ ও যত্নের সম্পূর্ণ গাইড

প্রকাশিত: ৮ অক্টোবর, ২০২৬

শেয়ার করুন:
শয্যাক্ষত (বেডসোর): কারণ, ধাপ, প্রতিরোধ ও যত্নের সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষ স্ট্রোক, মেরুদণ্ডের আঘাত, উন্নত বয়সের দুর্বলতা বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন, এবং তাদের একটি বড় অংশ বাড়িতেই পরিবারের সদস্যদের তত্ত্বাবধানে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বলছে, একই অবস্থানে একটানা চাপ পড়লে মাত্র দুই থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই ত্বকে ক্ষতির প্রথম লক্ষণ দেখা দিতে পারে — আর তা সময়মতো শনাক্ত না হলে কয়েক দিনেই গভীর, সংক্রমিত ঘায়ে রূপ নিতে পারে। অথচ এই শয্যাক্ষত (বেডসোর বা প্রেসার আলসার) বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক যত্ন ও সচেতনতায় সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। এই গাইডে শয্যাক্ষতের কারণ, ধাপ, প্রতিরোধ, ঘরোয়া যত্ন ও কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন তা বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

শয্যাক্ষত কী এবং কেন হয়?

শয্যাক্ষত তৈরি হয় যখন শরীরের হাড়ের কাছাকাছি কোনো অংশের ত্বক ও এর নিচের কোষে দীর্ঘসময় ধরে চাপ পড়ে এবং সেই স্থানে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে কোষগুলো অক্সিজেন ও পুষ্টি না পেয়ে ধীরে ধীরে মরে যায়, যার ফলে ত্বকে ক্ষত সৃষ্টি হয়। তিনটি মূল কারণ এতে ভূমিকা রাখে:

  • চাপ (Pressure): দীর্ঘসময় একই ভঙ্গিতে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে হাড়ের উপর ত্বকের উপর অবিরাম চাপ পড়ে।
  • ঘর্ষণ ও টান (Friction & Shear): বিছানায় টানাটানি করে সরানো বা হেলান দেওয়ার সময় ত্বকের উপরের ও নিচের স্তর বিপরীত দিকে টানা পড়ে, যা রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে।
  • আর্দ্রতা (Moisture): প্রস্রাব, ঘাম বা পায়খানায় ত্বক দীর্ঘসময় ভেজা থাকলে ত্বক দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সহজেই ক্ষত তৈরি হয়।

কাদের শয্যাক্ষতের ঝুঁকি বেশি?

নির্দিষ্ট কিছু অবস্থায় থাকা রোগীদের শয্যাক্ষতের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে:

  • ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সের রোগী — বয়সের সঙ্গে ত্বক পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যায়।
  • স্ট্রোক, পক্ষাঘাত (paralysis) বা স্পাইনাল কর্ড ইনজুরির রোগী, বিশেষ করে যাদের আক্রান্ত অংশে অনুভূতি (sensation) কমে গেছে এবং নিজে থেকে নড়াচড়া করতে পারেন না।
  • দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী বা হুইলচেয়ার-নির্ভর রোগী।
  • ডায়াবেটিস রোগী — রক্তনালি ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় ক্ষত দ্রুত তৈরি হয় এবং সারতে দেরি হয়।
  • অপুষ্টি বা কম ওজনের (low BMI) রোগী — রক্তে প্রোটিনের মাত্রা কম থাকলে ত্বক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা হারায়।
  • প্রস্রাব বা পায়খানার অসংযম (incontinence) আছে এমন রোগী।
  • ধূমপায়ী ও রক্তসংবহন সমস্যায় আক্রান্ত রোগী।

পেশাদার স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য সাধারণত Braden Scale নামে একটি মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়, যেখানে অনুভূতি, আর্দ্রতা, চলাফেরার ক্ষমতা, নড়াচড়া, পুষ্টি এবং ঘর্ষণ/টান — এই ছয়টি বিষয় মূল্যায়ন করে স্কোর দেওয়া হয়। স্কোর যত কম, ঝুঁকি তত বেশি।

শয্যাক্ষতের ধাপ বা স্টেজ

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (NPIAP) অনুযায়ী শয্যাক্ষতকে ক্ষতের গভীরতা অনুসারে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা হয়:

  • স্টেজ ১: ত্বক অক্ষত থাকে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট স্থানে লালচে বা গাঢ় দাগ দেখা যায় যা চাপ দিলেও সাদা হয় না (non-blanchable)। এই পর্যায়েই ব্যবস্থা নিলে সহজে প্রতিরোধ সম্ভব।
  • স্টেজ ২: ত্বকের উপরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফোস্কা বা অগভীর ঘা তৈরি হয়; ঘায়ের তলা গোলাপি বা লালচে এবং ভেজা থাকে।
  • স্টেজ ৩: ত্বকের সম্পূর্ণ স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চর্বির স্তর দেখা যেতে পারে, কিন্তু হাড় বা মাংসপেশি উন্মুক্ত হয় না।
  • স্টেজ ৪: ক্ষত সবচেয়ে গভীর পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে হাড়, মাংসপেশি বা টেন্ডন সরাসরি দেখা বা স্পর্শ করা যায়।
  • আনস্টেজেবল: ক্ষতের উপর মরা কোষ বা কালো আবরণ (slough/eschar) থাকায় প্রকৃত গভীরতা বোঝা যায় না; আবরণ সরালে সাধারণত স্টেজ ৩ বা ৪ বেরিয়ে আসে।
  • ডিপ টিসু ইনজুরি: ত্বক অক্ষত থাকলেও বেগুনি বা মেরুন রঙের দাগ বা রক্তভরা ফোস্কা দেখা যায়, যা নিচের কোষের গভীর ক্ষতির লক্ষণ।

শরীরের কোন অংশে শয্যাক্ষত বেশি হয়?

হাড়ের কাছাকাছি ও চাপ বেশি পড়ে এমন জায়গাগুলোতেই শয্যাক্ষত বেশি দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় কোমরের নিচের অংশ (sacrum/tailbone), এরপরেই সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গোড়ালিতে। এছাড়া নিতম্বের হাড়, কনুই, গোড়ালির গোল হাড়, কাঁধের ব্লেড এবং মাথার পেছনের অংশেও শয্যাক্ষত হতে পারে, বিশেষ করে যারা দীর্ঘসময় চিত হয়ে শুয়ে থাকেন।

নিজে কীভাবে পরীক্ষা করবেন — ব্লাঞ্চ টেস্ট

আঙুল দিয়ে লালচে স্থানে কয়েক সেকেন্ড চাপ দিয়ে ছেড়ে দিন। চাপ দেওয়ার পর স্থানটি সাদা হয়ে পরে আবার লালচে রং ফিরে আসলে তা স্বাভাবিক রক্ত সরবরাহের লক্ষণ। কিন্তু চাপ দেওয়ার পরও স্থানটি লালচে বা গাঢ় থেকে যায় (non-blanching), তাহলে এটি স্টেজ ১ শয্যাক্ষতের সংকেত এবং অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। গাঢ় রঙের ত্বকে এই পরিবর্তন বোঝা কঠিন হতে পারে — সেক্ষেত্রে ত্বকের তাপমাত্রা, শক্ততা বা ফোলাভাব দেখেও বিচার করা যায়।

প্রতিরোধের উপায়

শয্যাক্ষত প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো চাপ কমানো ও ত্বক শুষ্ক-পরিষ্কার রাখা:

  • নিয়মিত পাশ পরিবর্তন: প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর রোগীর শোয়ার ভঙ্গি পরিবর্তন করুন; হুইলচেয়ারে বসা রোগীর ক্ষেত্রে প্রতি ১৫-৩০ মিনিটে অবস্থান বদলানো উচিত। উচ্চমানের প্রেসার-রিলিফ ম্যাট্রেস ব্যবহার করলে কিছু গবেষণায় এই ব্যবধান কিছুটা বাড়ানো সম্ভব বলে দেখা গেছে, কিন্তু বাড়িতে সাধারণ বিছানায় দুই ঘণ্টার নিয়মই সবচেয়ে নিরাপদ।
  • নরম, পরিষ্কার বিছানা: সুতির নরম চাদর ব্যবহার করুন এবং নিয়মিত পরিবর্তন করুন। চাদরে ভাঁজ বা কুঁচকানো অংশ থাকলে তা সরিয়ে সমান করে দিন।
  • ত্বক শুষ্ক ও পরিষ্কার রাখা: প্রস্রাব-পায়খানার পর দ্রুত পরিষ্কার করে ত্বক শুকিয়ে নিন। প্রয়োজনে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন, তবে অতিরিক্ত ভেজা থাকতে দেবেন না।
  • প্রেসার-রিলিফ মাত্রাস বা কুশন: ফোম বা এয়ার ম্যাট্রেস, হিল-প্রোটেক্টর কুশন বাংলাদেশের মেডিকেল ইকুইপমেন্ট দোকান ও ফার্মেসিতে সাধারণত পাওয়া যায় এবং চাপযুক্ত স্থানে চাপ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত পুষ্টি: পর্যাপ্ত প্রোটিন, জিংক ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার ক্ষত সারাতে ও নতুন ক্ষত প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে। ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, দুধ এবং টাটকা ফল-সবজি খাদ্যতালিকায় রাখুন, সঙ্গে পর্যাপ্ত পানি পান করুন। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শে প্রোটিন বা জিংক সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
  • হালকা ব্যায়াম: সম্ভব হলে দিনে কয়েকবার হাত-পা নাড়ানো বা প্যাসিভ রেঞ্জ-অব-মোশন ব্যায়াম করান, যা রক্ত সরবরাহ ভালো রাখে।
  • দৈনিক ত্বক পরিদর্শন: প্রতিদিন অন্তত একবার হাড়ের কাছাকাছি অংশগুলো ভালোভাবে দেখুন — রং, তাপমাত্রা বা ফোলাভাবে কোনো পরিবর্তন আছে কিনা।

সঠিকভাবে শোয়ানোর কৌশল — ৩০ ডিগ্রি কোণ

রোগীকে পুরোপুরি কাত (৯০ ডিগ্রি) করে শোয়ালে কোমরের পাশের হাড়ের (hip bone) উপর সরাসরি অতিরিক্ত চাপ পড়ে। তার বদলে পিঠের নিচে বালিশ দিয়ে প্রায় ৩০ ডিগ্রি কোণে কাত করে শোয়ানো তুলনামূলক নিরাপদ, কারণ এতে শরীরের ওজন বড় একটি অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং কোনো একটি হাড়ের উপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না। একইভাবে গোড়ালির নিচে বালিশ বা নরম কুশন দিয়ে গোড়ালি বিছানা থেকে কিছুটা তুলে রাখলে — যাকে বলা হয় "ফ্লোটিং হিল" — গোড়ালিতে চাপ একেবারেই পড়ে না, যা গুরুত্বপূর্ণ কারণ গোড়ালি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দ্বিতীয় স্থান। হুইলচেয়ারে বসা রোগীর ক্ষেত্রে নিতম্বের নিচে জেল বা ফোম কুশন ব্যবহার করলে একই সুবিধা পাওয়া যায়।

কতদিনে সেরে ওঠে?

সেরে ওঠার সময় মূলত ক্ষতের ধাপ, রোগীর পুষ্টি অবস্থা ও সহ-রোগের উপর নির্ভর করে। স্টেজ ১-এর পরিবর্তন সঠিক যত্নে কয়েক দিনেই স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে, স্টেজ ২-এর ক্ষত সারতে সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে, আর স্টেজ ৩ বা ৪-এর গভীর ক্ষত সারতে কয়েক মাস এবং অনেক সময় বিশেষজ্ঞ ক্ষত-পরিচর্যা বা অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হতে পারে। ডায়াবেটিস বা অপুষ্টি থাকলে এই সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে।

ঘরোয়া যত্ন বনাম ডাক্তারের প্রয়োজন

স্টেজ ১ ও ২-এর ক্ষত সাধারণত বাড়িতেই সঠিক যত্নে সেরে যায় — চাপ সরিয়ে নেওয়া, ক্ষত পরিষ্কার-শুষ্ক রাখা এবং প্রয়োজনে পোভিডন-আয়োডিনের মতো অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে পরিষ্কার করাই যথেষ্ট। তবে নিয়মিত পাশ পরিবর্তন ও যত্নের পরও ক্ষত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উন্নতি না দেখালে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। স্টেজ ৩ বা ৪-এর ক্ষত, অথবা যে ক্ষতের গভীরতা বোঝা যাচ্ছে না (আনস্টেজেবল), তার জন্য পেশাদার ক্ষত-পরিচর্যা বা সার্জিক্যাল হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে — এটি ঘরোয়া উপায়ে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।

সংক্রমণের বিপদচিহ্ন — কখন জরুরি চিকিৎসা দরকার

নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে যান:

  • জ্বর বা শীত লাগা (সংক্রমণের প্রথম লক্ষণ হতে পারে)
  • ক্ষত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত বা পুঁজযুক্ত স্রাব
  • ক্ষতের চারপাশে ক্রমবর্ধমান লালচে ভাব, ফোলাভাব বা তাপ অনুভূত হওয়া
  • ক্ষতের ব্যথা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া
  • ক্ষতের চারপাশের ত্বক অস্বাভাবিক গরম বা শক্ত অনুভূত হওয়া

ডায়াবেটিস, বয়স্ক ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর জন্য বিশেষ সতর্কতা

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ক্ষত সারতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি থাকে — তাই পায়ের গোড়ালি ও তলার দিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি। বয়স্কদের ত্বক পাতলা ও কম স্থিতিস্থাপক হওয়ায় সামান্য চাপেই ক্ষত তৈরি হতে পারে, এবং অনেক সময় ব্যথার অনুভূতি কম থাকায় রোগী নিজে অভিযোগ করতে পারেন না — তাই নিয়মিত পরিদর্শন অপরিহার্য। স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের আক্রান্ত অংশে অনুভূতিই থাকে না, ফলে তারা নিজে চাপ বা অস্বস্তি বুঝতে পারেন না — এক্ষেত্রে ঘড়ি ধরে নির্দিষ্ট সময়ে পাশ পরিবর্তনের অভ্যাস তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।

শয্যাক্ষতকে অন্য চর্মসমস্যা থেকে আলাদা করা

শরীরের ভাঁজে (কুঁচকি, স্তনের নিচে) হওয়া আর্দ্রতাজনিত ফুসকুড়ি বা ছত্রাক সংক্রমণ (intertrigo) শয্যাক্ষতের মতো দেখতে লাগলেও এটি মূলত ঘাম-আর্দ্রতা জমে হয়, হাড়ের উপর সরাসরি চাপের কারণে নয়, এবং সাধারণত ছড়ানো লালচে, চুলকানিযুক্ত ফুসকুড়ি হিসেবে দেখা যায় — নির্দিষ্ট স্থানে গভীর ক্ষত তৈরি করে না। পার্থক্য স্পষ্ট না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ বা পারিবারিক চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।

পরিচর্যাকারীর জন্য একটি কথা

দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী রোগীর যত্ন নেওয়া শারীরিক ও মানসিকভাবে পরিবারের সদস্যদের জন্যও কষ্টকর হতে পারে। একজন ব্যক্তির একা সব সামলানো কঠিন হলে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে পাশ-পরিবর্তনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, বা প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত হোম-কেয়ার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে — ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে শয্যাশায়ী রোগীর যত্নে প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার সেবা বর্তমানে পাওয়া যায়। পরিচর্যাকারী নিজে সুস্থ ও বিশ্রামপ্রাপ্ত থাকলেই রোগীর যত্নও মানসম্মত থাকে।

প্রতিরোধই সর্বোত্তম চিকিৎসা

শয্যাক্ষত একবার গভীর ধাপে পৌঁছে গেলে তার চিকিৎসা দীর্ঘ, কষ্টদায়ক ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে — কিন্তু নিয়মিত পাশ পরিবর্তন, পরিষ্কার-শুষ্ক ত্বক, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং দৈনিক পরিদর্শনের মতো সহজ অভ্যাসে তা প্রায় সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। শয্যাশায়ী রোগীর পরিবারের সদস্য বা পরিচর্যাকারী হিসেবে প্রথম লালচে দাগ দেখেই সতর্ক হওয়া এবং প্রয়োজনে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা নেওয়াই রোগীর সুস্থতা ও স্বস্তি নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), National Pressure Injury Advisory Panel (NPIAP)-এর ক্ষত-স্তরায়ন মানদণ্ড এবং Cochrane-এর পুষ্টি-সংক্রান্ত পর্যালোচনা অনুসরণে লেখা।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

শয্যাক্ষত কত সময়ের মধ্যে তৈরি হতে পারে?
একই অবস্থানে একটানা চাপ পড়লে মাত্র দুই থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যেই ত্বকে প্রথম পরিবর্তন (লালচে, চাপ দিলেও না সাদা হওয়া দাগ) দেখা দিতে পারে। তাই নিয়মিত পাশ পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
কত ঘণ্টা পর পর শয্যাশায়ী রোগীর পাশ পরিবর্তন করা উচিত?
সাধারণ নিয়ম হলো প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর বিছানায় শোয়া রোগীর অবস্থান বদলানো এবং হুইলচেয়ারে বসা রোগীর ক্ষেত্রে প্রতি ১৫-৩০ মিনিটে। প্রেসার-রিলিফ ম্যাট্রেস থাকলে কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যবধান একটু বাড়ানো সম্ভব, তবে বাড়িতে দুই ঘণ্টার নিয়মই সবচেয়ে নিরাপদ।
শরীরের কোন অংশে শয্যাক্ষত সবচেয়ে বেশি হয়?
সবচেয়ে বেশি হয় কোমরের নিচের অংশে (সাক্রাম/টেইলবোন), আর দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি দেখা যায় গোড়ালিতে। এছাড়া নিতম্বের হাড়, কনুই ও কাঁধের ব্লেডেও হতে পারে।
ক্ষত সংক্রমিত হয়েছে কীভাবে বুঝব?
জ্বর বা শীত লাগা, ক্ষত থেকে দুর্গন্ধযুক্ত বা পুঁজযুক্ত স্রাব, চারপাশে বাড়তে থাকা লালচে ভাব বা ফোলাভাব এবং ক্ষতস্থান অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হওয়া সংক্রমণের লক্ষণ। এসব দেখা দিলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান।
শয্যাক্ষত প্রতিরোধে রোগীকে কী খাওয়ানো উচিত?
পর্যাপ্ত প্রোটিন (মাছ, মাংস, ডিম, ডাল), জিংক ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার এবং পর্যাপ্ত পানি ত্বক সুস্থ রাখতে ও ক্ষত সারাতে সহায়ক। অপুষ্টি থাকলে শয্যাক্ষতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ক্ষত ২৪-৪৮ ঘণ্টায় না সারলে কী করা উচিত?
নিয়মিত পাশ পরিবর্তন ও যত্নের পরও ক্ষত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উন্নতি না দেখালে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ এটি গভীর সংক্রমণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে শয্যাক্ষতের ঝুঁকি কি আলাদা?
হ্যাঁ। ডায়াবেটিসে রক্তনালি ও স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় ক্ষত দ্রুত তৈরি হয়, সারতে বেশি সময় লাগে এবং সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি। তাই ডায়াবেটিস রোগীর ত্বক, বিশেষত গোড়ালি ও পায়ের তলা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি।
শয্যাক্ষতের জন্য কি বিশেষ ম্যাট্রেস কেনা জরুরি?
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা রোগীর জন্য ফোম বা এয়ার প্রেসার-রিলিফ ম্যাট্রেস ব্যবহার করলে চাপ সমানভাবে ছড়িয়ে যায় এবং ঝুঁকি কমে। বাংলাদেশে মেডিকেল ইকুইপমেন্টের দোকান ও কিছু ফার্মেসিতে এগুলো পাওয়া যায়, তবে এটি নিয়মিত পাশ পরিবর্তনের বিকল্প নয়, সহায়ক মাত্র।
শেয়ার করুন:

পাঠকের মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

প্রকাশ করা হবে না

যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।

আরও খবর

Urinary Tract Infection (UTI): Symptoms, Causes, Diagnosis & Treatment

Urinary Tract Infection (UTI): Symptoms, Causes, Diagnosis & Treatment

UTIs affect an estimated 150 million people worldwide every year, and Bangladeshi hospital studies have found alarming antibiotic resistance among the bacteria that cause them. Here's what the symptoms, tests, and treatment really involve.

৮ অক্টোবর, ২০২৬

Urinary Incontinence in Older Adults: Causes, Types & Treatment

Urinary Incontinence in Older Adults: Causes, Types & Treatment

Up to 30% of adults over 60 experience urinary incontinence, with women affected twice as often as men — yet most cases are treatable once the type and cause are correctly identified rather than accepted as a normal part of aging.

৭ অক্টোবর, ২০২৬

গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা ও আয়রন সাপ্লিমেন্টের সম্পূর্ণ গাইড

গর্ভাবস্থায় রক্তাল্পতা: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা ও আয়রন সাপ্লিমেন্টের সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রতি দুইজন গর্ভবতী নারীর মধ্যে একজনের কাছাকাছি সংখ্যক নারী রক্তাল্পতায় (অ্যানিমিয়া) আক্রান্ত। লক্ষণ, বিপদচিহ্ন, পরীক্ষা, আয়রন ট্যাবলেটের নিয়ম ও প্রতিরোধের উপায় জেনে নিন।

৬ অক্টোবর, ২০২৬