osudhkosh

হাম ২০২৬: মহামারির কারণ, জটিলতা, বিপদ চিহ্ন ও টিকার সম্পূর্ণ গাইড

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শেয়ার করুন:
হাম ২০২৬: মহামারির কারণ, জটিলতা, বিপদ চিহ্ন ও টিকার সম্পূর্ণ গাইড

২০২৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হাম (Measles) মহামারির মুখোমুখি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ১,০০২ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে — যাদের সিংহভাগই পাঁচ বছরের নিচে। একই সময়ে দেশ ডেঙ্গুর রেকর্ড প্রকোপও মোকাবিলা করছে, ফলে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই লেখায় হাম কেন এত দ্রুত ছড়াচ্ছে, লক্ষণ কীভাবে ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়, কোন জটিলতাগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে, কখন হাসপাতালে ছোটা জরুরি এবং টিকা দিয়ে কীভাবে সন্তানকে রক্ষা করবেন — তার বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া হলো।

হাম কী এবং ২০২৬ সালে কেন এত ভয়াবহভাবে ছড়াচ্ছে?

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মিজলস ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়ানো ফোঁটার (droplet) মাধ্যমে এটি ছড়ায়, এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি র‍্যাশ ওঠার চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন। হাম এতটাই সংক্রামক যে টিকাবিহীন কোনো ব্যক্তি আক্রান্তের সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, এই মহামারির মূল কারণ ২০২৪-২৫ সালে দেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) সৃষ্ট বিঘ্ন। পরিসংখ্যান বলছে, এমআর১ (MR1) টিকার কভারেজ ২০২২ সালের প্রায় ১০০ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬.৫ শতাংশে এবং এমআর২ (MR2) কভারেজ ৯৭.৯ শতাংশ থেকে নেমে ৫৭.১ শতাংশে দাঁড়ায়। এত বড় সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে যাওয়ায় ভাইরাস দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। WHO-কে দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টি জেলায় প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার তথ্য জানানো হয়েছিল, এবং শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিল মাসে জরুরি জাতীয় হাম-রুবেলা (MR) ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ শিশুকে টিকা ও ভিটামিন এ দেওয়া। এই কর্মসূচিতে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া গেলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ শিশু এখনো টিকার আওতার বাইরে রয়ে গেছে, ফলে কাঙ্ক্ষিত হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হয়নি এবং সংক্রমণ এখনো চলমান।

লক্ষণ: ধাপে ধাপে কীভাবে প্রকাশ পায়

ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার পর গড়ে ১১-১২ দিন (৭ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত হতে পারে) ইনকিউবেশন পিরিয়ড চলে, এই সময় কোনো লক্ষণ থাকে না কিন্তু রোগী সুস্থ দেখালেও পরবর্তীতে সংক্রামক হয়ে উঠতে পারেন।

  • প্রোড্রোমাল পর্যায় (২-৪ দিন): তীব্র জ্বর (প্রায়ই ১০৪°ফা/৪০°সে ছাড়িয়ে যায়), তার সঙ্গে কাশি, সর্দি (coryza) এবং চোখ লাল হয়ে পানি পড়া (conjunctivitis) — এই তিনটি উপসর্গকে একসঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানে "থ্রি সি" (3 C's) বলা হয়।
  • কপলিক স্পট (Koplik spots): র‍্যাশ ওঠার ২-৩ দিন আগে মুখের ভেতরে, গালের ভেতরের দিকে (উপরের মোলার দাঁতের বিপরীতে) বালুকণার মতো সাদা ছোট ছোট দাগ দেখা যায়। প্রায় ৭০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে এই লক্ষণ দেখা যায় এবং এটি হাম নির্ণয়ের একটি নির্দিষ্ট (pathognomonic) চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • র‍্যাশ পর্যায়: জ্বর শুরুর ৩-৫ দিন পর মুখ ও চুলের গোড়া থেকে লালচে-বাদামি র‍্যাশ শুরু হয়ে ধীরে ধীরে ঘাড়, বুক, হাত-পা হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় জ্বর সাধারণত সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। র‍্যাশ ওঠার প্রায় ৩-৪ দিন পর থেকে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং একই ক্রমে (মুখ থেকে শুরু করে পায়ের দিকে) মিলিয়ে যায়, অনেক সময় হালকা খোসা ছাড়ানো ভাবও দেখা দেয়।

হাম বনাম চিকেনপক্স, রুবেলা ও ডেঙ্গু র‍্যাশ: পার্থক্য কীভাবে বুঝবেন

ডেঙ্গুও এখন ব্যাপক আকারে ছড়াচ্ছে বলে জ্বর-র‍্যাশ দেখলে বাবা-মায়েরা প্রায়ই বিভ্রান্ত হন। কিছু মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি —

  • হাম: তীব্র জ্বরের ৩-৫ দিন পর সমতল লালচে র‍্যাশ মুখ থেকে শুরু হয়ে নিচের দিকে ছড়ায়, সঙ্গে কাশি-সর্দি-চোখ লাল থাকে।
  • চিকেনপক্স: র‍্যাশ শুরু থেকেই তরল-ভরা ফোস্কার (vesicle) মতো, একসঙ্গে বিভিন্ন ধাপের ফোস্কা (নতুন-পুরনো মিশ্রিত) দেখা যায় এবং প্রচণ্ড চুলকানি থাকে।
  • রুবেলা: হামের তুলনায় জ্বর ও র‍্যাশ অনেক হালকা, দ্রুত (১-৩ দিনে) সেরে যায়, তবে গর্ভবতী নারীর জন্য গর্ভের শিশুর ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ।
  • ডেঙ্গু: র‍্যাশের সঙ্গে তীব্র শরীর ও মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা থাকে, প্লাটিলেট কমে যাওয়া ও রক্তক্ষরণের প্রবণতা দেখা দিতে পারে — যা হামে সাধারণত হয় না।

নিশ্চিত না হলে ঘরে বসে অনুমান না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ, বিশেষত বর্তমান পরিস্থিতিতে যখন দুটি রোগই একসঙ্গে সক্রিয়।

জটিলতা ও বিপদ চিহ্ন: কখন সতর্ক হবেন

হাম শুধু জ্বর-র‍্যাশের রোগ নয় — এটি মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে, বিশেষত অপুষ্ট বা টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে। WHO-র তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ২০ জন আক্রান্ত শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জনের নিউমোনিয়া হয়, প্রতি ১,০০০ জনে প্রায় ১ জনের মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস দেখা দেয়, এবং প্রতি ১,০০০ জনে ১ থেকে ৩ জন রোগ থেকেই মারা যেতে পারে। আক্রান্তদের প্রায় ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়।

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি —

  • শ্বাস দ্রুত বা কষ্টকর হওয়া, বুক ভেতরে দেবে যাওয়া (নিউমোনিয়ার লক্ষণ)
  • প্রচণ্ড ঘুম ঘুম ভাব, খিঁচুনি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা জ্ঞান হারানো (এনসেফালাইটিসের লক্ষণ)
  • ৩ দিনের বেশি ধরে ক্রমাগত উচ্চ জ্বর থাকা
  • কানে ব্যথা বা কান দিয়ে পুঁজ/তরল বের হওয়া (কানের সংক্রমণ)
  • চোখে তীব্র লালচেভাব, আলোতে তাকাতে না পারা বা চোখে ঘা (ভিটামিন এ-র অভাবজনিত জটিলতায় অন্ধত্বের ঝুঁকি)
  • তীব্র পাতলা পায়খানা বা বমির কারণে পানিশূন্যতা — মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া
  • শিশু খেতে-খাওয়াতে না পারা বা অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া

শিশু, পাঁচ বছরের কম বয়সীরা, বিশ বছরের বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্করা এবং অপুষ্টিতে ভোগা বা স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ রয়েছে এমন জনগোষ্ঠীর মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: ইমিউন অ্যামনেসিয়া ও বিরল স্নায়ুরোগ

হাম সেরে যাওয়ার পরও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাম আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আগে অর্জিত রোগ-প্রতিরোধী স্মৃতির (immune memory) একাংশ হারিয়ে ফেলে, যাকে "ইমিউন অ্যামনেসিয়া" বলা হয়। এর ফলে সুস্থ হয়ে ওঠার পরও কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত শিশুর শরীর অন্যান্য সাধারণ সংক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলক দুর্বল থাকতে পারে, এমনকি আগে যেসব রোগের টিকা নেওয়া হয়েছিল তার সুরক্ষাও কিছুটা কমে যেতে পারে। এছাড়া অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে, বিশেষত যাদের দুই বছর বয়সের আগে হাম হয়েছিল, রোগমুক্তির বহু বছর পর মস্তিষ্কে ধীরে ধীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলা সাব-অ্যাকিউট স্ক্লেরোজিং প্যানএনসেফালাইটিস (SSPE) নামের একটি মারাত্মক স্নায়ুরোগ দেখা দিতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিগুলোই হাম প্রতিরোধে টিকাদানকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

রোগ নির্ণয় কীভাবে হয়

সাধারণত চিকিৎসক জ্বর, কাশি-সর্দি-চোখ লাল হওয়া, কপলিক স্পট এবং র‍্যাশের বৈশিষ্ট্য দেখে ক্লিনিক্যালি হাম নির্ণয় করেন। বর্তমান মহামারির প্রেক্ষাপটে সন্দেহভাজন প্রতিটি রোগীকে সরকারিভাবে "সন্দেহভাজন হাম রোগী" (suspected case) হিসেবে গণ্য করে রিপোর্ট করা হয়, এবং প্রয়োজনে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে IgM অ্যান্টিবডি নিশ্চিত করা হয়। জটিলতার আশঙ্কা থাকলে বুকের এক্স-রে (নিউমোনিয়ার জন্য) বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।

চিকিৎসা ও ঘরোয়া যত্ন

হামের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই — চিকিৎসা মূলত সহায়ক (supportive)। তবে বর্তমান মহামারি মোকাবিলায় ভিটামিন এ-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

  • ভিটামিন এ: WHO-র নির্দেশনা অনুযায়ী পাঁচ বছরের নিচের প্রতিটি সন্দেহভাজন/নিশ্চিত হাম রোগীকে রোগ নির্ণয়ের দিন এবং তার পরদিন — মোট দুই ডোজ ভিটামিন এ দেওয়া হয়। চোখে ভিটামিন এ-র অভাবজনিত লক্ষণ থাকলে ৪-৬ সপ্তাহ পর তৃতীয় ডোজ দেওয়া হয়। এই প্রোটোকল জটিলতা ও মৃত্যুহার কমাতে সহায়ক বলে প্রমাণিত। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে বাড়তি ডোজ নেওয়া উচিত নয়।
  • জ্বর ও ব্যথা ব্যবস্থাপনা: প্যাকেজে নির্দেশিত মাত্রা অনুযায়ী প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ (যেমন Napa, Paracetamol) জ্বর ও অস্বস্তি কমাতে ব্যবহার করা যায়; শিশুর ওজন অনুযায়ী সঠিক ডোজের জন্য চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিন।
  • পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টি: ডায়রিয়া বা বমি হলে পানিশূন্যতা ঠেকাতে ওরাল স্যালাইন (ORS) খাওয়ানো জরুরি। সহজপাচ্য, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন।
  • চোখ ও ত্বকের যত্ন: চোখ পরিষ্কার রাখুন, কড়া আলো এড়িয়ে চলুন; ত্বকে বেশি ঘষামাজা না করে হালকাভাবে পরিষ্কার রাখুন।
  • আইসোলেশন: র‍্যাশ ওঠার অন্তত চার দিন পর্যন্ত আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশু ও টিকাবিহীন সদস্যদের থেকে আলাদা রাখুন, যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।

কখন হাসপাতালে ভর্তি জরুরি

ওপরে উল্লেখিত বিপদ চিহ্নগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে, অথবা শিশুর বয়স এক বছরের কম হলে, অপুষ্টিতে ভুগলে বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা (যেমন হৃদরোগ, রক্তস্বল্পতা) থাকলে — বাড়িতে অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে হাম-সংক্রান্ত জটিলতার চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

  • এক বছরের কম বয়সী শিশু: নিয়মিত টিকাদান সূচিতে প্রথম ডোজ (MR1) ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয় বলে তার আগে শিশুরা টিকাবিহীন ও সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও এই বয়সে কমে আসে।
  • অপুষ্ট শিশু: বিশেষত ভিটামিন এ-স্বল্পতাযুক্ত শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
  • গর্ভবতী নারী: গর্ভাবস্থায় হাম হলে গর্ভপাত, অকালপ্রসব বা কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে দ্রুত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা জরুরি।
  • ইমিউনোকম্প্রোমাইজড ব্যক্তি: যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কোনো কারণে দুর্বল (যেমন ক্যান্সার চিকিৎসাধীন বা দীর্ঘমেয়াদি স্টেরয়েড সেবনকারী), তাদের জটিলতার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং লক্ষণ দেরিতে বা অস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেতে পারে।

প্রতিরোধ: টিকাই একমাত্র কার্যকর সুরক্ষা

বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী প্রতিটি শিশুকে দুই ডোজ এমআর টিকা দেওয়া হয় — এমআর১ (MR1) ৯ মাস বয়সে এবং এমআর২ (MR2) ১৫ মাস বয়সে। দুই ডোজ সম্পূর্ণ হলে প্রায় ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা মেলে, যেখানে এক ডোজে সুরক্ষা প্রায় ৯৩ শতাংশ। বর্তমান মহামারির প্রধান কারণই ছিল বিপুলসংখ্যক শিশুর এই দুই ডোজ সম্পূর্ণ না হওয়া।

যেসব শিশু নির্ধারিত বয়সে টিকা নিতে পারেনি, তাদের জন্য সরকার এপ্রিল থেকে জাতীয় ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন চালু রেখেছে। সন্তানের টিকা কার্ড দেখে মিস হওয়া ডোজ থাকলে নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইপিআই কেন্দ্রে গিয়ে দ্রুত তা সম্পূর্ণ করানো উচিত — এতে শুধু নিজের সন্তানই নয়, প্রতিবেশী শিশুরাও (হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমে) সুরক্ষিত থাকে। এছাড়া —

  • আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যাওয়া এড়িয়ে চলুন, বিশেষত ভিড়পূর্ণ স্থানে।
  • বাসায় কেউ আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা ঘরে রাখুন ও নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখুন।
  • শিশুর পুষ্টি ও ভিটামিন এ-সমৃদ্ধ খাবার (যেমন গাঢ় হলুদ/সবুজ শাকসবজি, ডিম) নিয়মিত খাওয়ান, যা জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

শেষ কথা

২০২৬ সালের এই হাম মহামারি মনে করিয়ে দেয়, টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য ঘাটতিও কতটা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সন্তানের টিকার সময়সূচি মিস হয়ে থাকলে দেরি না করে আজই নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন, এবং জ্বর-র‍্যাশ বা ওপরে উল্লেখিত কোনো বিপদ চিহ্ন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য — ব্যক্তিগত চিকিৎসা সিদ্ধান্তের জন্য সবসময় একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ (UNICEF)-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন ও নির্দেশিকা অনুসরণে লেখা।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হাম কি একবার হলে দ্বিতীয়বার হতে পারে?
সাধারণত হাম একবার হলে আজীবন প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় এবং দ্বিতীয়বার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে এর মানে এই নয় যে টিকা নেওয়া অপ্রয়োজনীয় — টিকাই সবচেয়ে নিরাপদ সুরক্ষা পদ্ধতি।
শিশুর বয়স ৯ মাসের কম হলে হাম থেকে বাঁচার উপায় কী?
৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত সূচিতে টিকার আওতায় আসে না বলে তাদের আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা এবং ভিড়পূর্ণ স্থান এড়ানোই মূল সুরক্ষা। প্রাদুর্ভাবপ্রবণ এলাকায় থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আগেভাগে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
হাম হলে কি অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়?
হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ বলে অ্যান্টিবায়োটিক নিজে থেকে ভাইরাস সারায় না। তবে নিউমোনিয়া বা কানের সংক্রমণের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত জটিলতা দেখা দিলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করা উচিত নয়।
র‍্যাশ ওঠার পর কতদিন শিশুকে স্কুলে বা বাইরে পাঠানো উচিত নয়?
র‍্যাশ ওঠার তারিখ থেকে অন্তত চার দিন শিশুকে স্কুল, খেলার মাঠ বা অন্য জনসমাগমস্থল থেকে দূরে রাখা উচিত, কারণ এই সময় পর্যন্ত সে অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে।
গর্ভবতী নারীর হাম হলে করণীয় কী?
গর্ভাবস্থায় হাম হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ এতে গর্ভপাত, অকালপ্রসব বা কম ওজনের শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়তে পারে। গর্ভবতী অবস্থায় নিজে থেকে কোনো টিকা বা ওষুধ নেওয়ার আগেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
হাম আর ডেঙ্গুর র‍্যাশ কীভাবে আলাদা করব?
হামে সাধারণত তীব্র জ্বরের ৩-৫ দিন পর মুখ থেকে শুরু হয়ে সমতল র‍্যাশ নিচের দিকে ছড়ায়, সঙ্গে কাশি-সর্দি-চোখ লাল থাকে। ডেঙ্গুতে র‍্যাশের সঙ্গে তীব্র শরীর ও চোখের পেছনে ব্যথা এবং রক্তক্ষরণের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। নিশ্চিত না হলে অনুমান না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ভিটামিন এ কি শুধু হাম হলেই দিতে হয়?
হাম আক্রান্ত পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের জন্য দুই ডোজ ভিটামিন এ দেওয়ার নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যা জটিলতা কমাতে সহায়ক। তবে নিয়মিত ভিটামিন এ সম্পূরক জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবেও দেওয়া হয়ে থাকে; সঠিক ডোজের জন্য সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সন্তানের টিকার ডোজ মিস হয়ে গেলে এখন কী করব?
টিকা কার্ড দেখে মিস হওয়া এমআর১ বা এমআর২ ডোজ থাকলে দেরি না করে নিকটস্থ কমিউনিটি ক্লিনিক, ইপিআই কেন্দ্র বা চলমান ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইনে গিয়ে তা সম্পূর্ণ করান। বয়স নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিয়ে টিকা সম্পূর্ণ করা যায়।
শেয়ার করুন:

পাঠকের মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

প্রকাশ করা হবে না

যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।

আরও খবর