osudhkosh

হেপাটাইটিস বি: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

শেয়ার করুন:
হেপাটাইটিস বি: লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত, আর তাদের বেশিরভাগই জানেন না যে তারা সংক্রমিত — এই তথ্য উঠে এসেছে দেশের স্বাস্থ্য গবেষণায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে ২০২৪ সালে হেপাটাইটিস বি-জনিত মৃত্যুর ৬৯% ঘটেছে মাত্র ১০টি দেশে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত। মেটা-অ্যানালাইসিস গবেষণায় বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হেপাটাইটিস বি-র প্রকোপ পাওয়া গেছে প্রায় ৪-৬%, যা বিশ্বের গড় প্রকোপ (৩.৫%)-এর চেয়ে বেশি। সবচেয়ে ভয়ের কথা — এই রোগ বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে লিভারকে ধীরে ধীরে নষ্ট করতে পারে। তাই হেপাটাইটিস বি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং সময়মতো পরীক্ষা করানো জীবন বাঁচাতে পারে।

হেপাটাইটিস বি কী এবং এটি কীভাবে ছড়ায়

হেপাটাইটিস বি একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস (HBV) দ্বারা লিভারে সংক্রমণ ঘটায়। এটি মূলত রক্ত ও শরীরের অন্যান্য তরলের মাধ্যমে ছড়ায় — খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায় না। সংক্রমণের সাধারণ উপায়গুলো হলো:

  • সংক্রমিত মায়ের থেকে জন্মের সময় শিশুতে সংক্রমণ (ভার্টিকাল ট্রান্সমিশন)
  • অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক
  • রেজার, টুথব্রাশ বা নখকাটার মতো ব্যক্তিগত জিনিস ভাগাভাগি করা, যাতে রক্তের সংস্পর্শ হতে পারে
  • অনিরাপদভাবে জীবাণুমুক্ত না করা সিরিঞ্জ, ট্যাটু বা পিয়ার্সিংয়ের যন্ত্রপাতি ব্যবহার
  • রক্ত সঞ্চালনের সময় অস্ক্রিনড রক্ত ব্যবহার (বাংলাদেশে এখন ব্লাড ব্যাংকে স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক হওয়ায় এই ঝুঁকি কমেছে)

সাধারণ হাত মেলানো, একসাথে খাওয়া, কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায় না — এটি নিয়ে ভুল ধারণার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় অন্যায়ভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হন।

লক্ষণ: কেন একে "নিঃশব্দ ঘাতক" বলা হয়

হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের শুরুতে কোনো লক্ষণই থাকে না — এ কারণেই দেশে এত মানুষ নিজের অজান্তেই আক্রান্ত থেকে যান। ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সাধারণত ৬০ থেকে ১৫০ দিন (গড়ে প্রায় ৯০ দিন) পর যদি লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তা হতে পারে:

  • অস্বাভাবিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি
  • খাবারে অনীহা, বমি বমি ভাব
  • পেটের ডান পাশে উপরের দিকে ব্যথা বা অস্বস্তি (লিভারের অবস্থানে)
  • প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া
  • জন্ডিস — চোখ ও ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া
  • জ্বর ও গা-ম্যাজম্যাজে ভাব

সংক্রমণ ৬ মাসের বেশি স্থায়ী হলে এবং রক্তে HBsAg (Hepatitis B surface antigen) পজিটিভ থাকলে তাকে বলা হয় ক্রনিক (দীর্ঘমেয়াদি) হেপাটাইটিস বি। যারা শিশু বয়সে সংক্রমিত হন, তাদের ক্রনিক হওয়ার ঝুঁকি প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে অনেক বেশি — কারণ শিশুদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারে না।

ক্রনিক সংক্রমণের ধাপগুলো

চিকিৎসকরা ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-কে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করেন, যা নির্ধারণ করা হয় লিভার এনজাইম (ALT), HBV DNA-র পরিমাণ এবং HBeAg-র উপস্থিতি দেখে:

  • ইমিউন টলারেন্ট: ভাইরাসের পরিমাণ (HBV DNA) বেশি থাকলেও ALT স্বাভাবিক, লিভারে প্রদাহ কম — সাধারণত জন্ম থেকে সংক্রমিত শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেখা যায়
  • ইমিউন অ্যাকটিভ (HBeAg পজিটিভ): ALT বেড়ে যায়, লিভারে প্রদাহ ও ক্ষতি শুরু হয় — এই পর্যায়ে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে
  • ইনঅ্যাকটিভ ক্যারিয়ার: HBeAg নেগেটিভ, ভাইরাসের পরিমাণ কম, ALT স্বাভাবিক — তবুও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ জরুরি
  • HBeAg-নেগেটিভ ক্রনিক হেপাটাইটিস: ভাইরাসের পরিমাণ ও ALT ওঠানামা করে, লিভারের ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে

এই ধাপ নির্ণয়ের জন্যই শুধু একবার টেস্ট করিয়ে বসে থাকা যায় না — চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ টেস্ট করাতে হয়।

পরীক্ষা ও নির্ণয়

হেপাটাইটিস বি নির্ণয়ের জন্য সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করা হয়, যা বাংলাদেশের অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারেই পাওয়া যায়:

  • HBsAg টেস্ট: প্রাথমিক স্ক্রিনিং টেস্ট — পজিটিভ এলে এবং ৬ মাস পরেও পজিটিভ থাকলে ক্রনিক সংক্রমণ ধরা হয়
  • HBeAg ও Anti-HBe: ভাইরাস কতটা সক্রিয় ও সংক্রমণযোগ্য তা বোঝায়
  • HBV DNA (ভাইরাল লোড): রক্তে ভাইরাসের পরিমাণ নির্ধারণ করে, চিকিৎসা প্রয়োজন কিনা তা বোঝাতে সাহায্য করে
  • লিভার ফাংশন টেস্ট (ALT/SGPT, AST/SGOT): লিভারে প্রদাহ বা ক্ষতি হচ্ছে কিনা তা বোঝায়
  • আলট্রাসনোগ্রাম ও ফাইব্রোস্ক্যান/APRI স্কোর: লিভারে সিরোসিস বা ফাইব্রোসিস হয়েছে কিনা তা মূল্যায়নে ব্যবহৃত হয়

চিকিৎসা: কখন এবং কীভাবে

সবার ক্ষেত্রে ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হয় না — অনেক ইনঅ্যাকটিভ ক্যারিয়ার শুধু নিয়মিত পর্যবেক্ষণেই থাকেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৪ সালে তাদের নির্দেশিকা হালনাগাদ করে চিকিৎসা শুরুর যোগ্যতার মানদণ্ড আরও সহজ ও সম্প্রসারিত করেছে, যাতে আরও বেশি মানুষ (আগে যেখানে মাত্র ৮-১৫% যোগ্য বিবেচিত হতেন, নতুন নিয়মে সেখানে অঞ্চলভেদে অন্তত ৫০% পর্যন্ত মানুষ) চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন, এবং এখন ১২ বছরের বেশি বয়সী কিশোর-কিশোরীরাও এই নির্দেশিকার আওতায় পড়ে। চারটি মানদণ্ডের মধ্যে কেবল একটিতেই HBV DNA টেস্টের প্রয়োজন হয় — এতে টেস্টের অভাবে চিকিৎসা আটকে থাকার সমস্যা কমে।

চিকিৎসায় অগ্রাধিকার পান তারা, যাদের লিভারের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি বা জটিলতার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। চিকিৎসায় সাধারণত যে ওষুধ ব্যবহৃত হয় তা হলো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ টেনোফোভির (Tenofovir) ও এনটেকাভির (Entecavir) — এই দুটি ওষুধ ভাইরাসের প্রতিরোধ-ক্ষমতা তৈরির আশঙ্কা সবচেয়ে কম বলে প্রথম পছন্দের ওষুধ হিসেবে সুপারিশ করা হয়। ২-১১ বছরের শিশুদের ক্ষেত্রে এনটেকাভির অগ্রাধিকার পায়। এই ওষুধ কতদিন খেতে হবে, ডোজ কত হবে — তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে রোগীর টেস্ট রিপোর্ট ও চিকিৎসকের সিদ্ধান্তের উপর; নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা একেবারেই উচিত নয়, কারণ আকস্মিকভাবে বন্ধ করলে লিভারে তীব্র প্রদাহ (ফ্লেয়ার-আপ) হতে পারে। একজন লিভার বিশেষজ্ঞ বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের অধীনে নিয়মিত ফলো-আপ জরুরি।

হেপাটাইটিস বি কি একেবারে সেরে যায়?

অনেকের মনেই প্রথম প্রশ্ন থাকে — এই রোগ কি পুরোপুরি সেরে যায়? সত্যি বলতে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অ্যাকিউট (নতুন) সংক্রমণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজেই ভাইরাসকে পরাজিত করে এবং ৬ মাসের মধ্যে HBsAg নেগেটিভ হয়ে যায়। কিন্তু একবার ক্রনিক পর্যায়ে চলে গেলে, বর্তমান ওষুধে ভাইরাসকে সম্পূর্ণভাবে শরীর থেকে মুছে ফেলা কঠিন — কারণ এটি লিভার কোষের ভেতরে এক ধরনের সুপ্ত রূপে (cccDNA) থেকে যেতে পারে। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসার লক্ষ্য হয় ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখা ও লিভারের ক্ষতি আটকানো, যাকে বলা হয় "ফাংশনাল কন্ট্রোল"। বিরল কিছু ক্ষেত্রে বছরের পর বছর চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পর HBsAg সম্পূর্ণভাবে নেগেটিভ হয়ে যায়, যাকে "ফাংশনাল কিউর" বলা হয় — তবে এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। তাই নিয়মিত ফলো-আপ ছাড়া চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ করা উচিত নয়।

বুকের দুধ খাওয়ানো নিয়ে দুশ্চিন্তা

হেপাটাইটিস বি পজিটিভ মায়েদের একটি সাধারণ প্রশ্ন — শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ কিনা। শিশু যদি জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে টিকা নেয়, তাহলে সাধারণত বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ বলে বিবেচিত হয় — কারণ টিকাই মূল সুরক্ষা দেয়, বুকের দুধের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর তথ্য প্রমাণিত নয়। তবে মায়ের স্তনবৃন্তে ক্ষত বা রক্তপাত থাকলে সেই সময় সতর্কতা নেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গর্ভাবস্থা ও মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ

কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে, HBeAg-পজিটিভ বা উচ্চ ভাইরাল লোডযুক্ত মায়েদের থেকে শিশুতে সংক্রমণের ঝুঁকি ৭০-৯০%, আর HBeAg-নেগেটিভ মায়েদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ১০-৪০% — বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী। এই ঝুঁকি কমাতে WHO সুপারিশ করে, জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হেপাটাইটিস বি টিকার প্রথম ডোজ (বার্থ-ডোজ) দেওয়া, এবং পরে আরও কমপক্ষে দুটি ডোজ — তিন ডোজ সম্পূর্ণ হলে ৯৮-১০০% সুরক্ষা পাওয়া যায়, যা কমপক্ষে ২০ বছর স্থায়ী হতে পারে। উচ্চ ভাইরাল লোডযুক্ত মায়েদের গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে টেনোফোভির দেওয়ার সুপারিশও করা হয়।

এখানে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক আছে: বাংলাদেশের জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI)-তে হেপাটাইটিস বি টিকা পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার অংশ হিসেবে দেওয়া হয় ৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে — জন্মের সময় কোনো বার্থ-ডোজ দেওয়া হয় না। গবেষণা-প্রতিবেদন অনুযায়ী এই অঞ্চলে বাংলাদেশ ও নেপাল-ই এখনো এমন দুটি দেশ, যারা EPI-তে বার্থ-ডোজ যুক্ত করেনি। এর মানে, যদি কোনো মা হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হন, তাহলে তার নবজাতক জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ ভাইরাসের বিরুদ্ধে অরক্ষিত থাকতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত অ্যান্টেনেটাল চেকআপে HBsAg পরীক্ষা করা এবং মা পজিটিভ হলে সন্তান প্রসবের আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করে প্রাইভেটভাবে দ্রুততম সময়ে টিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, icddr,b-র একটি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বার্থ-ডোজ না থাকলেও বাংলাদেশের প্রচলিত তিন-ডোজ পেন্টাভ্যালেন্ট সূচি সাধারণ শিশুদের মধ্যে ক্রনিক HBV সংক্রমণ প্রতিরোধে উচ্চমাত্রায় কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে — তবে উচ্চ-ঝুঁকিতে থাকা (মা পজিটিভ) শিশুদের জন্য এই ফাঁক পূরণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

যারা ছোটবেলায় টিকা নেননি বা নিশ্চিত নন, তাদের জন্য প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়ও আলাদাভাবে ক্যাচ-আপ টিকা নেওয়ার সুযোগ আছে — বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী, সংক্রমিত ব্যক্তির পরিবারের সদস্য এবং একাধিক যৌন সঙ্গীর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এটি জোরালোভাবে সুপারিশ করা হয়।

শিশু, বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী

যে শিশুরা সংক্রমিত মায়ের গর্ভে জন্ম নিয়েছে, তাদের নির্ধারিত সময়ে HBsAg ও Anti-HBs পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত যে টিকা কার্যকর হয়েছে কিনা। দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-তে ভোগা বয়স্ক ব্যক্তিদের লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যানসারের (হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা) ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই তাদের জন্য নিয়মিত আলট্রাসনোগ্রাম ও AFP (আলফা-ফেটোপ্রোটিন) পরীক্ষা করানো জরুরি হতে পারে। যাদের আগে থেকে ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার বা অন্য কোনো লিভার রোগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ দ্রুত জটিলতার দিকে যেতে পারে — তাই এই গোষ্ঠীর জন্য আগে থেকেই স্ক্রিনিং করিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

হেপাটাইটিস বি বনাম হেপাটাইটিস এ ও ই — পার্থক্য বোঝা জরুরি

অনেকে হেপাটাইটিস বি-কে হেপাটাইটিস এ বা ই-র সাথে গুলিয়ে ফেলেন, কিন্তু এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে ছড়ায় (ফিকাল-ওরাল পথ), সাধারণত তীব্র (অ্যাকিউট) অসুখ সৃষ্টি করে এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজে থেকে সেরে যায় — এরা ক্রনিক রোগে পরিণত হয় না। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায় এবং দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) রোগে পরিণত হতে পারে, যা বছরের পর বছর ধরে নিঃশব্দে লিভারের ক্ষতি করতে থাকে। তাই উপসর্গ একই রকম মনে হলেও (জন্ডিস, ক্লান্তি), প্রতিরোধ ও চিকিৎসার পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা — এ কারণেই নির্দিষ্ট ব্লাড টেস্ট করিয়ে সঠিক নির্ণয় জরুরি, অনুমানের উপর ভিত্তি করে নয়।

জটিলতা: চিকিৎসা না করালে কী হতে পারে

অনেক বছর ধরে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ ছাড়া থাকলে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি থেকে লিভার সিরোসিস (লিভার শক্ত ও সংকুচিত হয়ে যাওয়া), লিভার ফেইলিওর এবং সবচেয়ে গুরুতর ক্ষেত্রে লিভার ক্যানসার হতে পারে। এই কারণেই নিয়মিত ফলো-আপ এবং প্রয়োজনে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা এত গুরুত্বপূর্ণ — লক্ষণ না থাকলেও।

কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন

  • চোখ বা ত্বক হলদে হয়ে গেলে, প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে গেলে
  • দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা পেটের উপরের ডান পাশে ব্যথা থাকলে
  • পরিবারের কারো হেপাটাইটিস বি নির্ণয় হলে — সঙ্গী বা পরিবারের অন্যদেরও টেস্ট করানো জরুরি
  • গর্ভবতী হলে নিয়মিত অ্যান্টেনেটাল চেকআপের অংশ হিসেবে
  • রক্তদান বা অস্ত্রোপচারের আগে নিজের স্ট্যাটাস নিশ্চিত না থাকলে

প্রতিরোধ

  • টিকা: হেপাটাইটিস বি টিকা (যেমন Engerix-B, Euvax-B, Hepavax-B) সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ — শিশুদের জন্য EPI-র পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার মাধ্যমে এবং প্রাপ্তবয়স্ক অরক্ষিত ব্যক্তিদের জন্য আলাদাভাবে নেওয়া যায়
  • গর্ভবতী মায়েদের HBsAg স্ক্রিনিং করানো এবং পজিটিভ হলে নবজাতকের জন্য দ্রুত টিকার ব্যবস্থা নেওয়া
  • রেজার, টুথব্রাশ, নখকাটা জাতীয় ব্যক্তিগত জিনিস কারো সাথে ভাগাভাগি না করা
  • নিরাপদ যৌন সম্পর্ক ও বাধা-পদ্ধতি (কনডম) ব্যবহার
  • জীবাণুমুক্ত সুই-সিরিঞ্জ ব্যবহার, এবং সনদপ্রাপ্ত জায়গা থেকেই ট্যাটু বা পিয়ার্সিং করানো
  • আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের টিকা ও স্ক্রিনিং করিয়ে নেওয়া

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র হেপাটাইটিস বি নির্দেশিকা, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র অনুসরণে লেখা।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

হেপাটাইটিস বি কী এবং এটি কীভাবে ছড়ায়?
হেপাটাইটিস বি একটি ভাইরাসজনিত লিভার সংক্রমণ, যা রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে ছড়ায় — মা থেকে নবজাতকে, অরক্ষিত যৌন সম্পর্কে, বা রেজার-সিরিঞ্জের মতো জিনিস ভাগাভাগি করে। এটি খাবার, পানি বা সাধারণ স্পর্শে ছড়ায় না।
হেপাটাইটিস বি কি একেবারে সেরে যায়, নাকি সারা জীবন থাকে?
অ্যাকিউট সংক্রমণের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীর নিজেই ৬ মাসের মধ্যে ভাইরাস সরিয়ে দেয়। তবে একবার ক্রনিক পর্যায়ে গেলে ভাইরাস সম্পূর্ণ দূর করা কঠিন; চিকিৎসার লক্ষ্য হয় ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা ও লিভারের ক্ষতি আটকানো।
আমার শরীরে কোনো লক্ষণ নেই, তাহলে কি আমি আক্রান্ত হতে পারি?
হ্যাঁ, বরং এটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক — অধিকাংশ আক্রান্ত মানুষের শুরুতে কোনো লক্ষণই থাকে না। তাই ঝুঁকি থাকলে বা অনিশ্চয়তা থাকলে HBsAg পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই একমাত্র নিশ্চিত উপায়।
গর্ভবতী মা হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হলে শিশুর কী হতে পারে?
কোনো ব্যবস্থা না নিলে HBeAg-পজিটিভ বা উচ্চ ভাইরাল লোডযুক্ত মায়ের থেকে শিশুতে সংক্রমণের ঝুঁকি ৭০-৯০%। তবে জন্মের পর সময়মতো টিকা দিলে এবং প্রয়োজনে মাকে গর্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিলে এই ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
কোন টেস্ট দিয়ে হেপাটাইটিস বি নির্ণয় করা হয়?
মূল স্ক্রিনিং টেস্ট HBsAg। পজিটিভ এলে HBeAg, HBV DNA (ভাইরাল লোড) ও লিভার ফাংশন টেস্ট (ALT/AST) করিয়ে রোগের পর্যায় ও চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা হয়।
হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস এ বা ই-র পার্থক্য কী?
এ ও ই ছড়ায় দূষিত খাবার-পানির মাধ্যমে এবং সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়, ক্রনিক হয় না। হেপাটাইটিস বি ছড়ায় রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে এবং দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) রোগে পরিণত হতে পারে।
পরিবারের একজনের হেপাটাইটিস বি থাকলে অন্যদের কী করা উচিত?
পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীর HBsAg পরীক্ষা করানো উচিত। যারা আগে টিকা নেননি বা নিশ্চিত নন, তাদের ক্যাচ-আপ টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
হেপাটাইটিস বি পজিটিভ মা কি বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন?
শিশু জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে টিকা পেলে সাধারণত বুকের দুধ খাওয়ানো নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। মায়ের স্তনবৃন্তে ক্ষত বা রক্তপাত থাকলে সেই সময় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শেয়ার করুন:

পাঠকের মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

প্রকাশ করা হবে না

যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।

আরও খবর

উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন): লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

উচ্চ রক্তচাপ (হাইপারটেনশন): লক্ষণ, কারণ, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড

WHO-র ২০২৫ সালের রিপোর্ট বলছে বিশ্বে ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত আর বাংলাদেশে প্রতি ৮ জনে মাত্র ১ জনের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আছে — লক্ষণ, ধাপ, নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইড।

২৩ অক্টোবর, ২০২৬

Insulin Therapy: Types, Injection Technique & Storage Guide

Insulin Therapy: Types, Injection Technique & Storage Guide

Bangladesh has an estimated 13.9 million adults with diabetes, yet needle fear remains the top reason patients delay insulin. Here is what to actually know about insulin types, injection technique, storage, and treating low blood sugar.

২২ অক্টোবর, ২০২৬

প্রি-এক্লাম্পসিয়া: গর্ভাবস্থার উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও প্রতিরোধের গাইড

প্রি-এক্লাম্পসিয়া: গর্ভাবস্থার উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ ও প্রতিরোধের গাইড

বাংলাদেশে মাতৃমৃত্যুর প্রায় ২৪%-এর পেছনে দায়ী প্রি-এক্লাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়া — জানুন এর লক্ষণ, বিপদ চিহ্ন, পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়।

২১ অক্টোবর, ২০২৬