osudhkosh

নবজাতক শিশুর ঘুম: দিনে কত ঘণ্টা ঘুমানো স্বাভাবিক?

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শেয়ার করুন:
নবজাতক শিশুর ঘুম: দিনে কত ঘণ্টা ঘুমানো স্বাভাবিক?

নবজাতক শিশুকে দিনের বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়ে থাকতে দেখে অনেক বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়েন। আবার কোনো শিশু বারবার জেগে উঠলে মনে হতে পারে, সে ঠিকমতো ঘুমাচ্ছে না। আসলে নবজাতকের ঘুমের ধরন বড় শিশু বা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো নয়। তাদের ঘুম সাধারণত ছোট ছোট সময়ে ভাগ হয়ে থাকে এবং ক্ষুধার কারণে বারবার জেগে উঠতে পারে।

নবজাতক দিনে কত ঘণ্টা ঘুমায়?

জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসে অনেক নবজাতক ২৪ ঘণ্টায় মোটামুটি ১৪–১৭ ঘণ্টা ঘুমাতে পারে। তবে প্রতিটি শিশুর ঘুমের প্রয়োজন এক নয়। কোনো শিশু কিছুটা বেশি বা কম ঘুমাতেও পারে।

বিষয়

সাধারণ তথ্য

মোট ঘুম

প্রায় ১৪–১৭ ঘণ্টা/২৪ ঘণ্টা

একটানা ঘুম

সাধারণত দীর্ঘ সময় নয়

দিনে ঘুম

একাধিক ছোট ঘুম

রাতে ঘুম

বারবার জেগে উঠতে পারে

ঘুম ভাঙার প্রধান কারণ

ক্ষুধা, ডায়াপার, অস্বস্তি ইত্যাদি

শুধু মোট কত ঘণ্টা ঘুমাচ্ছে তা নয়, শিশুর দুধ খাওয়া, প্রস্রাব, জাগ্রত অবস্থায় স্বাভাবিক আচরণ এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন নবজাতক এত বেশি ঘুমায়?

নবজাতকের শরীর ও মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। ঘুম তাদের বৃদ্ধি ও বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে তাদের পাকস্থলী ছোট হওয়ায় দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা সম্ভব নয়। ফলে কয়েক ঘণ্টা পরপর ঘুম ভেঙে বুকের দুধ খেতে পারে।

অনেক নবজাতকের ক্ষেত্রে দিন-রাতের পার্থক্যও প্রথম দিকে পরিষ্কার থাকে না। তাই দিনের বেলায় বেশি ঘুম এবং রাতে বারবার জেগে ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

নবজাতক একটানা কতক্ষণ ঘুমাতে পারে?

সব শিশুর ক্ষেত্রে একই নিয়ম নেই। নবজাতক সাধারণত কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর পর জেগে দুধ খেতে পারে। বিশেষ করে জন্মের প্রথম দিকে শিশুর নিয়মিত খাওয়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

যদি শিশু খুব দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকে এবং জাগানোর পরও দুধ খেতে না চায় বা জাগানো কঠিন হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।

শিশুর ঘুমের স্বাভাবিক লক্ষণ

শিশু ঘুমানোর সময়—

  • চোখ বন্ধ থাকবে এবং শরীর শিথিল থাকবে।

  • মাঝে মাঝে হাত-পা নড়তে পারে।

  • মুখে বিভিন্ন ধরনের অভিব্যক্তি দেখা যেতে পারে।

  • হালকা শব্দ বা নড়াচড়া হতে পারে।

  • কখনো কখনো অল্প সময়ের জন্য চোখ খুলে আবার বন্ধ করতে পারে।

নবজাতকের ঘুমের মধ্যে কিছু নড়াচড়া বা শব্দ হওয়া সবসময় সমস্যা নির্দেশ করে না।

নবজাতককে কীভাবে নিরাপদে ঘুম পাড়াবেন?

নবজাতকের ঘুমের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১. চিৎ করে শোয়ান

ঘুমানোর সময় শিশুকে চিৎ করে শোয়ানো সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থান। পাশ ফিরে বা উপুড় করে ঘুম পাড়ানো এড়িয়ে চলুন।

২. শক্ত ও সমতল জায়গায় শোয়ান

শিশুর ঘুমের জায়গা শক্ত ও সমতল হওয়া উচিত। অতিরিক্ত নরম গদি বা এমন কোনো জায়গা ব্যবহার করবেন না যেখানে শিশুর মুখ বা শরীর ডুবে যেতে পারে।

৩. শিশুর ঘুমের জায়গা খালি রাখুন

শিশুর ঘুমের জায়গায়—

  • বালিশ

  • নরম খেলনা

  • ভারী কম্বল

  • অতিরিক্ত কুশন

  • ঢিলেঢালা কাপড়

রাখা উচিত নয়। এগুলো শিশুর মুখ ঢেকে শ্বাস নিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

৪. অতিরিক্ত গরম করবেন না

শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় বা কম্বলে ঢেকে রাখবেন না। ঘরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন এবং শিশুর শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে কি না খেয়াল করুন।

দিনে ঘুমানো আর রাতে জেগে থাকা কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ, নবজাতকের ক্ষেত্রে এটি বেশ স্বাভাবিক হতে পারে। জন্মের পর তাদের শরীরের দিন-রাতের ঘুমের ছন্দ পুরোপুরি তৈরি থাকে না।

দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলো ও স্বাভাবিক ঘরের পরিবেশ বজায় রাখতে পারেন। রাতে আলো কমিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। সময়ের সঙ্গে শিশুর ঘুমের ছন্দ ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে।

শিশুকে ঘুম থেকে তুলে দুধ খাওয়াতে হবে কি?

এটি শিশুর বয়স, জন্মের ওজন, ওজন বৃদ্ধির ধারা এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করতে পারে।

বিশেষ করে জন্মের প্রথম কয়েকদিন বা শিশুর ওজন নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকলে কতক্ষণ পরপর শিশুকে জাগিয়ে দুধ খাওয়াতে হবে, তা শিশুর চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

নিজে থেকে দীর্ঘ সময় শিশুকে না খাইয়ে রাখবেন না।

কোন লক্ষণগুলোতে সতর্ক হবেন?

শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ঘুমাচ্ছে মনে হলে নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করুন—

  • শিশুকে জাগানো খুব কঠিন।

  • জাগানোর পরও বুকের দুধ খেতে চায় না।

  • চোষার শক্তি খুব কম মনে হয়।

  • প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

  • শিশু অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ থাকে।

  • শ্বাস নিতে কষ্ট হয় বা শ্বাসের ধরন অস্বাভাবিক মনে হয়।

  • বারবার বমি হয়।

  • শিশুর জ্বর থাকে।

  • ত্বক বা ঠোঁট নীলচে দেখায়।

এসব লক্ষণের কোনোটি থাকলে দ্রুত শিশুর চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

নবজাতকের ঘুম নিয়ে বাবা-মায়ের সাধারণ ভুল ধারণা

“বেশি ঘুম মানেই শিশু অসুস্থ”

সবসময় নয়। নবজাতকের অনেক ঘুমানো স্বাভাবিক। তবে শিশুকে স্বাভাবিকভাবে জাগানো যায় কি না এবং সে ভালোভাবে দুধ খাচ্ছে কি না—এগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

“রাতে একটানা ঘুমানো উচিত”

নবজাতকের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় একটানা ঘুমানো প্রত্যাশা করা ঠিক নয়। ক্ষুধার কারণে রাতে বারবার জেগে উঠতে পারে।

“শিশু কাঁদলেই ঘুমের সমস্যা”

সবসময় নয়। ক্ষুধা, গ্যাস, ভেজা ডায়াপার, গরম বা ঠান্ডা লাগা কিংবা অন্য অস্বস্তির কারণেও শিশু কাঁদতে পারে।

মনে রাখবেন

নবজাতকের ঘুমের কোনো একক “পারফেক্ট” সময়সূচি নেই। ২৪ ঘণ্টায় মোট ঘুমের পরিমাণ, নিয়মিত দুধ খাওয়া, প্রস্রাব, ওজন বৃদ্ধি এবং শিশুর সামগ্রিক আচরণ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুকে চিৎ করে, শক্ত ও সমতল জায়গায় এবং বালিশ বা নরম জিনিস ছাড়া নিরাপদ পরিবেশে ঘুম পাড়ানো।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

১. নবজাতক দিনে ১৮ ঘণ্টা ঘুমালে কি সমস্যা?
একেক শিশুর ঘুমের প্রয়োজন একেক রকম। মোট ঘুমের পাশাপাশি শিশু সহজে জাগছে কি না, দুধ খাচ্ছে কি না এবং স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করছে কি না—এসবও বিবেচনা করতে হবে।
২. নবজাতক রাতে বারবার জেগে উঠলে কি স্বাভাবিক?
হ্যাঁ। ক্ষুধার কারণে নবজাতক রাতে বারবার জেগে বুকের দুধ খেতে পারে।
৩. নবজাতককে উপুড় করে ঘুম পাড়ানো যাবে?
না। ঘুমের সময় শিশুকে চিৎ করে শোয়ানো নিরাপদ পদ্ধতি।
৪. শিশুর ঘুমের জায়গায় বালিশ দেওয়া যাবে?
নবজাতকের ঘুমের জায়গায় বালিশ, নরম খেলনা বা ঢিলেঢালা নরম জিনিস না রাখাই নিরাপদ।
৫. নবজাতক ঘুমের মধ্যে নড়াচড়া করলে কি ভয় পাওয়ার কারণ আছে?
সবসময় নয়। নবজাতকের ঘুমের মধ্যে হাত-পা নড়ানো বা বিভিন্ন শব্দ করা হতে পারে। তবে শ্বাসকষ্ট, নীলচে হয়ে যাওয়া বা অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
৬. নবজাতককে ঘুম পাড়ানোর জন্য দুধ খাওয়ানো যাবে?
বুকের দুধ খাওয়ার পর অনেক শিশু স্বাভাবিকভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে। তবে প্রতিবার শুধু ঘুম পাড়ানোর জন্য দুধ খাওয়ানোর বদলে শিশুর ক্ষুধার সংকেতও লক্ষ্য করুন।
৭. নবজাতক দিনে বেশি আর রাতে কম ঘুমালে কী করবেন?
দিনে স্বাভাবিক আলো ও পরিবেশ রাখুন এবং রাতে আলো ও শব্দ কমিয়ে শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন। সময়ের সঙ্গে শিশুর দিন-রাতের ছন্দ পরিণত হতে থাকে।
৮. কখন শিশুর অতিরিক্ত ঘুম নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
যদি শিশুকে জাগানো কঠিন হয়, দুধ খেতে না চায়, খুব নিস্তেজ থাকে, প্রস্রাব কমে যায়, শ্বাসকষ্ট হয় বা জ্বর থাকে—তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শেয়ার করুন:

পাঠকের মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।

মন্তব্য লিখুন

মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

প্রকাশ করা হবে না

যাচাইয়ের পর প্রকাশ করা হবে।

আরও খবর