নবজাতকের জন্ডিস: কখন স্বাভাবিক, কখন বিপজ্জনক? লক্ষণ ও করণীয়
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নবজাতকের জন্ডিস কী?
জন্মের পর শিশুর ত্বক বা চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়াকে সাধারণভাবে নবজাতকের জন্ডিস (Newborn Jaundice) বলা হয়। এর প্রধান কারণ হলো রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin) নামের হলুদ রঙের একটি পদার্থের মাত্রা বেড়ে যাওয়া।
শিশুর শরীরে পুরোনো লোহিত রক্তকণিকা ভাঙার সময় বিলিরুবিন তৈরি হয়। সাধারণত লিভার বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত করে শরীর থেকে বের করে দিতে সাহায্য করে। কিন্তু জন্মের পর প্রথম কয়েকদিন নবজাতকের লিভার পুরোপুরি পরিপক্ব না থাকায় বিলিরুবিন দ্রুত জমতে পারে।
এ কারণেই জন্মের পর কয়েকদিনের মধ্যে অনেক শিশুর হালকা জন্ডিস দেখা যায়।
নবজাতকের জন্ডিস কতটা সাধারণ?
নবজাতকের জন্ডিস বেশ সাধারণ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি সাময়িক। সাধারণ ধরনের জন্ডিস প্রায়ই জন্মের ২–৩ দিনের মধ্যে দেখা দেয় এবং পরবর্তী কয়েকদিনে বেশি স্পষ্ট হয়ে ধীরে ধীরে কমে যায়। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে প্রায় ১–২ সপ্তাহের মধ্যে এটি ভালো হয়ে যায়।
তবে সব ধরনের জন্ডিসকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শিশুর বয়স, জন্মের সময়কাল, খাওয়ানোর অবস্থা এবং বিলিরুবিনের মাত্রা বিবেচনা করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন জন্ডিসটি পর্যবেক্ষণ করলেই হবে, নাকি চিকিৎসা প্রয়োজন।
নবজাতকের জন্ডিসের প্রধান লক্ষণ
জন্ডিসের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো শিশুর ত্বক বা চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া।
যেসব পরিবর্তন খেয়াল করতে পারেন:
মুখ ও কপালে হলুদাভ রং
চোখের সাদা অংশ হলুদ হওয়া
বুক ও পেটের দিকে হলুদভাব ছড়িয়ে পড়া
হাত-পা পর্যন্ত হলুদ হয়ে যাওয়া
কিছু ক্ষেত্রে মুখের ভেতরেও হলুদভাব দেখা যেতে পারে
সাধারণত জন্ডিস প্রথমে মুখে দেখা যায় এবং বিলিরুবিনের মাত্রা বাড়লে শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে শুধু ত্বকের রং দেখে বিলিরুবিনের মাত্রা নির্ভরযোগ্যভাবে বোঝা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বিলিরুবিন পরীক্ষা করেন।
গাঢ় ত্বকের শিশুর ক্ষেত্রে ত্বকের হলুদভাব বোঝা কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে চোখের সাদা অংশ ও মুখের ভেতরের রংও খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ।
কখন নবজাতকের জন্ডিস সাধারণত কম উদ্বেগের?
যদি শিশুর—
জন্ডিস জন্মের কয়েকদিন পর শুরু হয়
নিয়মিত বুকের দুধ খায়
স্বাভাবিকভাবে জাগে ও নড়াচড়া করে
প্রস্রাব ও পায়খানা হচ্ছে
জন্ডিস ধীরে ধীরে কমে আসে
অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ না থাকে
তাহলে অনেক ক্ষেত্রে এটি সাধারণ নবজাতকের জন্ডিস হতে পারে।
তবে শিশুর জন্ডিস দেখা গেলে বিষয়টি শিশুর চিকিৎসককে জানানো ভালো, কারণ শুধু দেখে জন্ডিসের মাত্রা নিশ্চিত করা যায় না।
কখন নবজাতকের জন্ডিস বিপজ্জনক হতে পারে?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয় হলো জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জন্ডিস দেখা দেওয়া।
এটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় জন্ডিসের স্বাভাবিক সময় নয় এবং দ্রুত চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এ ছাড়া নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি:
লক্ষণ | কেন গুরুত্বপূর্ণ |
|---|---|
জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জন্ডিস | দ্রুত মূল্যায়ন প্রয়োজন |
শিশুকে জাগানো কঠিন | গুরুতর অসুস্থতার সংকেত হতে পারে |
দুধ খেতে না চাওয়া বা দুর্বলভাবে খাওয়া | পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়ার ঝুঁকি |
শিশুর শরীর অতিরিক্ত নিস্তেজ বা অস্বাভাবিক শক্ত হয়ে যাওয়া | জরুরি মূল্যায়ন প্রয়োজন |
জন্ডিস দ্রুত বাড়তে থাকা | বিলিরুবিন পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে |
জন্ডিস পা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া | বেশি মাত্রার জন্ডিসের সম্ভাবনা |
প্রস্রাব খুব গাঢ় হওয়া | বিশেষ মূল্যায়ন প্রয়োজন |
পায়খানা ফ্যাকাশে/সাদাটে হওয়া | লিভার বা পিত্তনালির সমস্যার সংকেত হতে পারে |
প্রস্রাব খুব কম হওয়া | পানিশূন্যতার সংকেত হতে পারে |
জ্বর বা শ্বাসকষ্ট | দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন |
নবজাতকের জন্ডিস কেন হয়?
নবজাতকের জন্ডিসের বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
১. লিভার পুরোপুরি পরিপক্ব না হওয়া
জন্মের পর শিশুর লিভার বিলিরুবিন প্রক্রিয়াজাত ও শরীর থেকে বের করে দেওয়ার কাজে পুরোপুরি দক্ষ হয়ে উঠতে কিছুটা সময় নেয়। এটি নবজাতকের সাধারণ জন্ডিসের অন্যতম কারণ।
২. পর্যাপ্ত দুধ না পাওয়া
শিশু ঠিকমতো বুকের দুধ না পেলে শরীর থেকে বিলিরুবিন বের হওয়ার প্রক্রিয়ায় সমস্যা হতে পারে। তাই জন্ডিসের সময় শিশুর feeding ভালো হচ্ছে কি না, তা বিশেষভাবে খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপের অমিল
কিছু ক্ষেত্রে মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপের পার্থক্যের কারণে শিশুর লোহিত রক্তকণিকা দ্রুত ভেঙে যেতে পারে এবং বিলিরুবিন বেড়ে যেতে পারে।
৪. অকাল জন্ম
সময় হওয়ার আগেই জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্ডিসের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে এবং তাদের আরও ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।
৫. সংক্রমণ বা লিভারের সমস্যা
কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ, লিভারের সমস্যা বা পিত্তনালির সমস্যার কারণেও জন্ডিস হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণ নবজাতকের জন্ডিসের মতো শুধু অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
জন্ডিস হলে কী পরীক্ষা করা হয়?
শিশুর জন্ডিস দেখা গেলে চিকিৎসক শিশুর বয়স, জন্মের সময়কাল, শারীরিক অবস্থা এবং জন্ডিসের মাত্রা বিবেচনা করেন।
প্রয়োজনে বিলিরুবিনের মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। এটি ত্বকে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করে বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে মাপা যেতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নবজাতকের ক্ষেত্রে শুধু “বিলিরুবিন কত” এই একটি সংখ্যা দিয়ে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। শিশুর বয়স কত ঘণ্টা, কত সপ্তাহে জন্মেছে এবং অন্য কোনো ঝুঁকি আছে কি না—এসবও বিবেচনা করা হয়।
নবজাতকের জন্ডিসের চিকিৎসা কী?
বেশিরভাগ হালকা জন্ডিসের ক্ষেত্রে আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না এবং শিশুকে নিয়মিত খাওয়ানো ও পর্যবেক্ষণ করা হয়।
যদি বিলিরুবিনের মাত্রা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়, চিকিৎসক Phototherapy বা ফটোথেরাপি দিতে পারেন।
এতে বিশেষ ধরনের আলো ব্যবহার করে শিশুর শরীরে জমে থাকা বিলিরুবিনকে এমনভাবে পরিবর্তন করতে সাহায্য করা হয়, যাতে তা শরীর থেকে সহজে বের হতে পারে।
খুব গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে আরও বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে exchange transfusion বা রক্ত পরিবর্তনের মতো চিকিৎসাও প্রয়োজন হতে পারে।
জন্ডিস হলে শিশুকে রোদে রাখবেন?
না।
নবজাতকের জন্ডিস কমানোর জন্য শিশুকে সরাসরি রোদে রাখা নিরাপদ বা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফটোথেরাপি দেওয়া হয়।
তাই জন্ডিস দেখলে নিজের মতো করে রোদে রাখা, কোনো ঘরোয়া চিকিৎসা দেওয়া বা ওষুধ খাওয়ানো উচিত নয়।
জন্ডিস হলে বুকের দুধ বন্ধ করবেন?
সাধারণভাবে শুধু জন্ডিস হয়েছে বলে বুকের দুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
শিশুকে পর্যাপ্ত দুধ খাওয়ানো গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত feeding শিশুর শরীর থেকে বিলিরুবিন বের হতে সাহায্য করে। অনেক ক্ষেত্রে দিনে প্রায় ৮–১২ বার খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে শিশুর বয়স, feeding pattern ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা ভিন্ন হতে পারে।
শিশু ঠিকমতো দুধ না খেলে বা বারবার ঘুমিয়ে গেলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
জন্ডিস কতদিন থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
বেশিরভাগ সাধারণ নবজাতকের জন্ডিস কয়েকদিনের মধ্যে কমতে থাকে। তবে জন্ডিস দীর্ঘস্থায়ী হলে কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে:
জন্ডিস কমার পরিবর্তে বাড়ছে
২ সপ্তাহের পরও জন্ডিস রয়েছে
শিশুর পায়খানা সাদাটে বা খুব ফ্যাকাশে
প্রস্রাব অস্বাভাবিক গাঢ়
শিশু ঠিকমতো দুধ খাচ্ছে না
শিশুর ওজন বা feeding নিয়ে সমস্যা হচ্ছে
এগুলো থাকলে শিশুর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
🚨 কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন?
নবজাতকের ক্ষেত্রে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নিন:
জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জন্ডিস দেখা দিয়েছে
শিশু জাগানো খুব কঠিন
শিশু দুধ খাচ্ছে না
শরীর অস্বাভাবিকভাবে নিস্তেজ বা শক্ত হয়ে যাচ্ছে
খিঁচুনি বা অস্বাভাবিক ঝাঁকুনির মতো নড়াচড়া হচ্ছে
শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে
প্রস্রাব হচ্ছে না বা খুব কম হচ্ছে
জ্বর বা শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক
জন্ডিস দ্রুত বাড়ছে
খুব বেশি বিলিরুবিন চিকিৎসা না করে দীর্ঘসময় থাকলে বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। তাই গুরুতর জন্ডিসকে অবহেলা করা উচিত নয়।
বাবা-মায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
নবজাতকের জন্ডিস দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ এটি অনেক শিশুরই হয়। তবে “জন্ডিস মানেই স্বাভাবিক”—এমন ধারণাও ঠিক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো:
শিশুর ত্বক ও চোখের রং লক্ষ্য করুন।
শিশু নিয়মিত দুধ খাচ্ছে কি না দেখুন।
প্রস্রাব ও পায়খানার পরিবর্তন লক্ষ্য করুন।
জন্ডিস কখন শুরু হয়েছে তা মনে রাখুন।
জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় জন্ডিস হলে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসা দেবেন না।
জন্ডিসের মাত্রা জানতে প্রয়োজন হলে বিলিরুবিন পরীক্ষা করান।
চিকিৎসক ফটোথেরাপির পরামর্শ দিলে তা অনুসরণ করুন।
তথ্যসূত্র
American Academy of Pediatrics (AAP) / HealthyChildren.org
NHS – National Health Service
Cambridge University Hospitals NHS Foundation Trust
Royal Free London NHS Foundation Trust
মেডিকেল নোট: এই লেখাটি শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে তৈরি। নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্ডিসের চিকিৎসার সিদ্ধান্ত শিশুর বয়স (ঘণ্টা হিসেবে), গর্ভকাল, বিলিরুবিনের মাত্রা এবং অন্যান্য ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু এই লেখার ভিত্তিতে শিশুর চিকিৎসা শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
নবজাতকের জন্ডিস কি স্বাভাবিক?
জন্মের প্রথম দিনেই জন্ডিস হলে কী করবেন?
জন্ডিস হলে কি বুকের দুধ খাওয়ানো যাবে?
জন্ডিসের জন্য শিশুকে রোদে রাখা কি নিরাপদ?
জন্ডিসের চিকিৎসায় ফটোথেরাপি কী?
জন্ডিসে শিশুর পায়খানা কেমন হওয়া উচিত?
জন্ডিস কি শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে?
পাঠকের মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।


