পানিতে ডুবে যাওয়া: প্রাথমিক চিকিৎসা, সিপিআর ও প্রতিরোধের গাইড
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায় বলে বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গ্লোবাল রিপোর্ট অন ড্রাউনিং অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে—আর পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ এটি। অথচ সঠিক সময়ে সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সহজ কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে এই মৃত্যুর একটি বড় অংশ ঠেকানো সম্ভব। এই লেখায় ডুবে যাওয়ার কারণ, লক্ষণ, ধাপে ধাপে প্রাথমিক চিকিৎসা, সিপিআর, সেকেন্ডারি ড্রাউনিং এবং প্রতিরোধ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ডুবে যাওয়া (Drowning) আসলে কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডুবে যাওয়া মানে হলো, পানিতে বা তরল পদার্থে নাক-মুখ ডুবে যাওয়ার ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা তৈরি হওয়া। এর ফলে শরীরে অক্সিজেনের অভাব (হাইপক্সিয়া) দেখা দেয়, যা কয়েক মিনিটের মধ্যেই মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। ডুবে যাওয়ার ফলাফল তিন রকম হতে পারে—সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য জটিলতা নিয়ে বেঁচে থাকা, অথবা মৃত্যু। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পানি থেকে তোলার পর শিশু বা ব্যক্তি সুস্থ মনে হলেও কয়েক ঘণ্টা পর জটিলতা দেখা দিতে পারে—এই বিষয়টি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি এত ঝুঁকিপূর্ণ কেন?
ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ (CIPRB)-এর গবেষণা অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর আনুমানিক ১৮,৬৬৫ জন মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়, যার মধ্যে প্রায় ১৪,২৬৯ জনই শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর 'স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২২' প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ৭ শতাংশের বেশি ঘটে পানিতে ডুবে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে—
- ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে, কারণ এই বয়সে শিশুরা হাঁটাচলা শুরু করে কিন্তু বিপদ বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়নি।
- প্রায় ৭০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাড়ির কাছের পুকুর বা জলাশয়ে—দূরের নদী বা বড় জলাশয়ে নয়।
- বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে দিনের বেলা, যখন মা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকেন বা বাবা কাজে বাইরে থাকেন, আর শিশুটি অল্প সময়ের জন্য অরক্ষিত অবস্থায় থাকে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে সরকার 'বাংলাদেশ ড্রাউনিং প্রিভেনশন স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড প্ল্যান ২০২৫' গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ডুবে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা।
ডুবে যাওয়ার লক্ষণ চেনার উপায়
সিনেমায় দেখানো হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করার দৃশ্যের বিপরীতে, বাস্তবে ডুবে যাওয়া প্রায়শই নীরব। এটিকে বলা হয় "সাইলেন্ট ড্রাউনিং"। লক্ষণগুলো হলো—
- মাথা পানির উপরে রাখার চেষ্টায় থুতনি উঁচু করে রাখা, মুখ পানির উপরে-নিচে হওয়া
- চোখ বন্ধ বা ঘোলাটে দৃষ্টি, চুল মুখের উপর থাকলেও সরানোর চেষ্টা না করা
- শব্দ করে সাহায্য চাইতে না পারা—কারণ শ্বাস নেওয়াই তখন প্রধান কাজ, কথা বলা নয়
- খাড়াভাবে পানিতে ভাসতে থাকা অথচ পা দিয়ে সাঁতরানোর কোনো চিহ্ন না থাকা (এটিকে বলে "ইনস্টিংকটিভ ড্রাউনিং রেসপন্স")
শিশুরা খেলার সময়ও চুপচাপ হয়ে যেতে পারে বলে অভিভাবকদের সবসময় সরাসরি চোখে দেখে তদারকি করা জরুরি—আশেপাশে থাকাই যথেষ্ট নয়।
তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা: ধাপে ধাপে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউরোপিয়ান রিসাসিটেশন কাউন্সিলের (ERC) নির্দেশনা অনুযায়ী নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন—
১. নিরাপদে পানি থেকে তুলুন
নিজে প্রশিক্ষিত না হলে সরাসরি পানিতে ঝাঁপ দেবেন না। একজন ডুবন্ত মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে উদ্ধারকারীও ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে অনেক ঘটে। সম্ভব হলে লাঠি, দড়ি, বাঁশ বা ভাসমান কিছু বাড়িয়ে দিন এবং ব্যক্তিকে টেনে তুলুন। পানিতে নেমে উদ্ধারের কৌশল শুধুমাত্র বারবার প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদেরই করা উচিত।
২. সাড়া ও শ্বাস পরীক্ষা করুন
ব্যক্তিকে সমতল ও শক্ত জায়গায় শুইয়ে দিন। ডেকে বা আলতো ঝাঁকিয়ে সাড়া আছে কি না দেখুন। বুক ওঠানামা করছে কি না লক্ষ করুন এবং মুখের কাছে কান নিয়ে শ্বাসের শব্দ শোনার ও অনুভব করার চেষ্টা করুন (দেখুন-শুনুন-অনুভব করুন পদ্ধতি)।
৩. প্রথমে ৫টি রেসকিউ শ্বাস দিন
সাধারণ হৃদযন্ত্র বন্ধ হওয়ার (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) চিকিৎসার সঙ্গে ডুবে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এখানেই। যেহেতু ডুবে যাওয়ায় প্রথমে অক্সিজেনের অভাব হয়, তাই WHO ও ERC পরামর্শ দেয়—শ্বাসনালী খুলে প্রথমে ৫টি রেসকিউ শ্বাস (মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস) দিতে হবে, তারপর প্রয়োজনে সাধারণ সিপিআর শুরু করতে হবে।
৪. প্রয়োজনে সিপিআর শুরু করুন
শ্বাস বা সাড়া না থাকলে দেরি না করে সিপিআর শুরু করুন এবং কাউকে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স/হাসপাতালে খবর দিতে বলুন। আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী—
- ৩০টি বুক চাপ + ২টি শ্বাস—এই অনুপাতে চক্র চালিয়ে যান
- বুক চাপের গতি হবে মিনিটে ১০০-১২০ বার
- প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বুক প্রায় ৫ সেন্টিমিটার (দুই ইঞ্চির মতো) নিচে চাপুন; শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের গভীরতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ
- শিশুদের (ইনফ্যান্ট) ক্ষেত্রে দুই আঙুলের বদলে এক হাতের তালুর গোড়া বা দুই বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে বুক ঘিরে ধরার কৌশল ব্যবহার করা উচিত—এটি ২০২৫ সালের হালনাগাদ নির্দেশনা
- বুক চাপে বিরতি যেন ১০ সেকেন্ডের বেশি না হয়
ফুসফুস থেকে পানি "বের করার" চেষ্টায় সময় নষ্ট করা ঠিক নয়—এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা এবং এতে সিপিআর শুরু করতে বিলম্ব হয়, যা রোগীর জন্য ক্ষতিকর।
শ্বাস ফিরে এলে কী করবেন: রিকভারি পজিশন
সিপিআর বা রেসকিউ শ্বাসের পর যদি ব্যক্তি নিজে থেকে শ্বাস নিতে শুরু করে এবং সাড়া দেয়, তাহলে তাকে সরাসরি চিৎ করে শুইয়ে রাখবেন না—এতে বমি বা ফুসফুসে থাকা পানি শ্বাসনালীতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এক পাশ ফিরিয়ে, উপরের পা ও হাত সামনের দিকে বাঁকিয়ে শরীরকে ভারসাম্যে রেখে শুইয়ে দিন (রিকভারি পজিশন), মাথা সামান্য নিচু ও পেছনে হেলানো রাখুন যাতে মুখ দিয়ে পানি বা বমি সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থানে রেখে ক্রমাগত শ্বাস ও সাড়া পর্যবেক্ষণ করুন এবং যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যান—শ্বাস স্বাভাবিক মনে হলেও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ ছাড়া বাড়িতে রাখা নিরাপদ নয়।
বর্ষা ও বন্যার মৌসুমে বাড়তি ঝুঁকি
বাংলাদেশে বর্ষা ও বন্যা-প্রবণ মাসগুলোতে (সাধারণত জুন থেকে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত) পুকুর, খাল ও নিচু জমিতে পানি বেড়ে যাওয়ায় বাড়ির উঠানের কাছেও গভীর পানির উপস্থিতি তৈরি হয়, যা সাধারণ সময়ে নিরাপদ মনে হওয়া জায়গাগুলোকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। এই সময় শিশুরা বাড়ির আঙিনায় খেলতে গিয়ে হঠাৎ পানিতে পড়ে যেতে পারে, আবার বন্যার পানিতে স্রোত থাকায় প্রাপ্তবয়স্করাও ভারসাম্য হারিয়ে ডুবে যেতে পারেন। এই মৌসুমে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে—উঠানের চারপাশে পানির স্তর নিয়মিত লক্ষ রাখা, শিশুদের একা বাইরে খেলতে না দেওয়া এবং সন্ধ্যার পর পানির কাছাকাছি চলাচল এড়িয়ে চলা জরুরি।
সেকেন্ডারি ও ড্রাই ড্রাউনিং: ২৪-৪৮ ঘণ্টা সতর্ক থাকুন
পানি থেকে তোলার পর শিশু স্বাভাবিক দেখালেও বিপদ পুরোপুরি কেটে যায়নি ধরে নেওয়া ভুল। দুটি অবস্থা সম্পর্কে জানা জরুরি—
- ড্রাই ড্রাউনিং: পানির সংস্পর্শে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লক্ষণ দেখা দেয়।
- সেকেন্ডারি (ডিলেইড) ড্রাউনিং: ফুসফুসে সামান্য পানি ঢোকার পর লক্ষণ দেখা দিতে ১ থেকে ২৪ ঘণ্টা, কখনো কখনো ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—ক্রমাগত কাশি, শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস, বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ঝিমুনি, বমি ভাব, এবং আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন (খিটখিটে ভাব বা অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া)। পানিতে পড়ে যাওয়া বা কোনোভাবে পানি খেয়ে ফেলার ঘটনার পর পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা শিশুকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণে রাখুন—রাতে ঘুমের মধ্যে কাশি বাড়লে তা অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কখন হাসপাতালে নিতে হবে
নিচের যেকোনো পরিস্থিতিতে দেরি না করে হাসপাতালে নিয়ে যান—
- পানি থেকে তোলার পর অজ্ঞান বা স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিচ্ছে না
- উদ্ধারের পর কিছু সময় সাড়া ফিরে এলেও পরে আবার শ্বাসকষ্ট, কাশি বা ঝিমুনি দেখা দেয়
- পানি অনেকটা গিলে ফেলেছে বা বমি করেছে
- ঠোঁট বা মুখ নীলচে হয়ে গিয়েছিল
গবেষণায় দেখা গেছে, পানিতে ডুবে যাওয়ার পর সুস্থ বলে মনে হওয়া রোগীও পরবর্তীতে অ্যাসপিরেশন নিউমোনিয়া (ফুসফুসে পানি ঢোকার কারণে সংক্রমণ) বা ফুসফুসে পানি জমার (পালমোনারি ইডিমা) কারণে অবনতির দিকে যেতে পারেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় কোনো লক্ষণ না থাকলেও। তাই চিকিৎসকরা সাধারণত ন্যূনতম ৬ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখার পরামর্শ দেন, আর উপসর্গ থাকলে ২৪-৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হাসপাতালে রাখা হতে পারে। প্রয়োজনে বুকের এক্স-রে করে ফুসফুসে পানি বা সংক্রমণের চিহ্ন আছে কি না দেখা হয়।
বিশেষ বিবেচনা: কার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন
শিশু ও টডলার
১ থেকে ৪ বছর বয়সীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। এই বয়সে শিশুরা বালতি, গামলা বা অগভীর পানিতেও ডুবে যেতে পারে—তাই শুধু পুকুর-নদী নয়, ঘরের ভেতরের পানির পাত্রও নজরে রাখা জরুরি।
বয়স্ক ব্যক্তি ও দীর্ঘমেয়াদি রোগী
হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা স্ট্রোকের ইতিহাস থাকা বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পানিতে পড়ে যাওয়ার পর হৃদযন্ত্রে বাড়তি চাপ পড়তে পারে—উদ্ধারের পর সুস্থ মনে হলেও দ্রুত মেডিকেল চেকআপ করানো উচিত।
সাঁতার না জানা ব্যক্তি ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ এলাকায় শিশু ও নারীরা সাঁতার শেখার সুযোগ কম পান, যা ঝুঁকি বাড়ায়। প্রাথমিক সাঁতার ও পানিতে ভেসে থাকার কৌশল শেখা প্রাণ বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গর্ভবতী নারী
গর্ভাবস্থায় শরীরের ভারসাম্য পরিবর্তিত হওয়ায় পিচ্ছিল ঘাট বা পুকুরপাড়ে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। দুর্ঘটনার পর সামান্য পানি গিলে ফেললেও বা আঘাত পেলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, কারণ অক্সিজেনের সাময়িক ঘাটতিও গর্ভস্থ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে করণীয়
গবেষণা বলছে, চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই ডুবে মৃত্যু ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। বাংলাদেশে পরীক্ষিত ও কার্যকর কিছু পদ্ধতি—
- প্লেপেন ব্যবহার: ৯ থেকে ৩৬ মাস বয়সী শিশুদের জন্য ঘেরা প্লেপেন ব্যবহার করলে মা রান্না বা ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকা অবস্থাতেও শিশু নিরাপদে থাকে।
- আঁচল-মডেল কমিউনিটি ডে-কেয়ার: CIPRB-এর "আঁচল" কর্মসূচিতে প্রশিক্ষিত "আঁচল মা" সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ২০-৩০ জন শিশুকে জলাশয় থেকে দূরে নিরাপদ ঘরে তদারকি করেন—এটি দুর্ঘটনাপ্রবণ সময়ে কার্যকর সমাধান।
- সুইমসেফ (SwimSafe) প্রশিক্ষণ: স্কুলগামী শিশুদের বেসিক সাঁতার ও নিরাপদ উদ্ধার কৌশল শেখানো হয়, যা ডুবে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সফল হয়েছে বলে প্রমাণিত।
- পুকুর ও জলাশয় ঘেরাও করা: বাড়ির কাছের পুকুরে বেড়া বা প্রতিবন্ধক দেওয়া, যেহেতু বেশিরভাগ দুর্ঘটনা বাড়ির কাছের জলাশয়েই ঘটে।
- সার্বক্ষণিক সরাসরি তদারকি: পানির কাছে থাকা শিশুকে কখনো একা রাখবেন না, এমনকি কয়েক মুহূর্তের জন্যও নয়।
- প্রাপ্তবয়স্কদের সিপিআর ও নিরাপদ উদ্ধার প্রশিক্ষণ: কমিউনিটির মানুষ প্রশিক্ষিত থাকলে দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক মিনিটেই জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়—আর নিজে না ঝাঁপিয়ে "লাঠি বা দড়ি বাড়িয়ে" উদ্ধারের কৌশল জানা থাকলে উদ্ধারকারীর মৃত্যুও এড়ানো যায়।
সরকারের অনুমোদিত "ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রোটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেফ ফ্যাসিলিটিজ" প্রকল্পের মতো উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে এই মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংক্ষেপে মনে রাখুন
- ডুবন্ত মানুষ প্রায়ই নীরবে ডোবে—হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি বা চিৎকার নাও থাকতে পারে
- নিজে না ঝাঁপিয়ে দড়ি/লাঠি দিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করুন
- শ্বাস না থাকলে প্রথমে ৫টি রেসকিউ শ্বাস, তারপর ৩০:২ অনুপাতে সিপিআর
- পানি থেকে তোলার পর সুস্থ মনে হলেও পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা সতর্ক দৃষ্টি রাখুন
- কাশি, শ্বাসকষ্ট বা ঝিমুনি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিন
- টডলারদের জন্য প্লেপেন, বাড়ির কাছের পুকুরে বেড়া এবং সার্বক্ষণিক সরাসরি তদারকি—এই তিনটি সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ পদক্ষেপ
এই লেখাটি শুধুমাত্র সাধারণ তথ্যের জন্য। প্রতিটি পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে ডুবে যাওয়ার যেকোনো ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা ও একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউরোপিয়ান রিসাসিটেশন কাউন্সিল (ERC), ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ (CIPRB) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসরণে লেখা।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
শিশু পানিতে পড়ে গিয়ে তোলার পর স্বাভাবিক লাগছে, তবুও কি চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে?
ড্রাই ড্রাউনিং ও সেকেন্ডারি ড্রাউনিং এর মধ্যে পার্থক্য কী?
পানিতে ডুবে যাওয়া কাউকে উদ্ধারের সময় সবচেয়ে বড় ভুল কোনটি?
সিপিআর দেওয়ার সময় কত অনুপাতে বুকে চাপ ও শ্বাস দিতে হয়?
ফুসফুস থেকে পানি বের করার জন্য উপুড় করে পিঠে চাপ দেওয়া কি ঠিক?
বাংলাদেশে কোন বয়সী শিশুরা পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে?
বাসায় ছোট শিশু থাকলে ডুবে যাওয়া ঠেকাতে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ কী?
শ্বাস ফিরে আসার পর ব্যক্তিকে কীভাবে শুইয়ে রাখা উচিত?
পাঠকের মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।


