শিশুদের হাম (Measles): লক্ষণ, ঘরোয়া যত্ন, খাবারের তালিকা ও কখন ডাক্তার দেখাবেন
প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬

শিশুদের হাম (Measles) কী?
শিশুদের হাম বা Measles একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সাধারণত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করলেও যাদের হাম হয়নি বা টিকা নেওয়া হয়নি, তারাও আক্রান্ত হতে পারেন। রোগটি শুরুতে সাধারণ জ্বর বা সর্দির মতো মনে হলেও কয়েকদিন পর শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দেয়।
সঠিক সময়ে যত্ন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। তবে অবহেলা করলে নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ কিংবা চোখের সমস্যার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
শিশুদের হাম কেন হয়?
হাম Measles virus দ্বারা হয়ে থাকে। এই ভাইরাস খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে।
সংক্রমণের প্রধান কারণগুলো হলো—
আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাতাসে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া।
আক্রান্ত শিশুর খুব কাছাকাছি থাকা।
ভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করা।
টিকা না নেওয়া শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
হামের সাধারণ লক্ষণ
হামের লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়।
প্রথমদিকে দেখা যায়—
উচ্চমাত্রার জ্বর
কাশি
নাক দিয়ে পানি পড়া
চোখ লাল হওয়া
শিশুর দুর্বল লাগা
খেতে অনীহা
কয়েকদিন পরে দেখা দেয়—
কানের পেছন থেকে শুরু হওয়া লাল র্যাশ
র্যাশ ধীরে ধীরে মুখ, বুক, পিঠ এবং পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়া
জ্বর আরও বেড়ে যাওয়া
শিশুদের হাম হলে কী করবেন?
শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করুন।
১. পর্যাপ্ত তরল পান করান
জ্বরের কারণে শরীর থেকে পানি বের হয়ে যায়।
শিশুকে দিন—
পানি
ডাবের পানি
ওরস্যালাইন
পাতলা স্যুপ
বুকের দুধ (যদি শিশু পান করে)
২. পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিন
হামের সময় শরীর দুর্বল থাকে।
শিশুকে বিশ্রামে রাখুন।
অতিরিক্ত খেলাধুলা করতে দেবেন না।
ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
৩. পুষ্টিকর খাবার দিন
সহজে হজম হয় এমন খাবার বেশি উপকারী।
যেমন—
নরম খিচুড়ি
জাউ
ডাল
সেদ্ধ ডিম
মাছ
সবজি
ফল
৪. জ্বর নিয়ন্ত্রণ করুন
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে।
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ শুরু করবেন না।
৫. চোখের যত্ন নিন
হামের সময় অনেক শিশুর চোখ লাল হয়ে যায়।
পরিষ্কার কাপড় দিয়ে চোখ মুছুন।
খুব উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলুন।
হাম হলে কী খাবেন?
শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে নিচের খাবারগুলো উপকারী।
ডাবের পানি
ওরস্যালাইন
নরম ভাত
খিচুড়ি
ডাল
গাজর
কুমড়া
মিষ্টি আলু
ডিম
মাছ
চিকেন স্যুপ
পাকা পেঁপে
কলা
কমলা
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
হামের সময় নিচের খাবারগুলো কম দেওয়া ভালো—
অতিরিক্ত ঝাল খাবার
ভাজাপোড়া
ফাস্টফুড
কোমল পানীয়
অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার
বেশি তেলযুক্ত খাবার
হাম প্রতিরোধের উপায়
হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা নেওয়া।
এছাড়াও—
আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
নিয়মিত হাত ধুতে শেখান।
হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢাকতে বলুন।
অসুস্থ শিশুকে কিছুদিন আলাদা রাখুন।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান—
শ্বাসকষ্ট
বারবার খিঁচুনি
শিশুর অস্বাভাবিক ঘুমিয়ে থাকা
পানি বা খাবার একেবারে না খাওয়া
কানে পুঁজ হওয়া
খুব বেশি জ্বর দীর্ঘসময় থাকা
উপসংহার
হাম একটি সংক্রামক রোগ হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক পরিচর্যা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করলে শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা নিশ্চিত করা। এতে ভবিষ্যতে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
FAQ
হাম কতদিন থাকে?
সাধারণত ৭–১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ কমে আসে। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে প্রায় দুই সপ্তাহ লাগতে পারে।
হাম হলে গোসল করানো যাবে?
হ্যাঁ। কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করানো বা শরীর মুছে দেওয়া নিরাপদ।
হাম কি আবার হতে পারে?
সাধারণত একবার হাম হলে শরীরে দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তাই দ্বিতীয়বার হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
হাম হলে কি অ্যান্টিবায়োটিক লাগে?
হাম ভাইরাসজনিত রোগ। তাই অ্যান্টিবায়োটিক সবসময় প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
হামের সবচেয়ে ভালো প্রতিরোধ কী?
সময়নিষ্ঠ MR/MMR টিকা গ্রহণই হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
পাঠকের মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
মন্তব্যে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শ চাওয়া বা দেওয়া থেকে বিরত থাকুন — নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।


